জ্ঞানেশ্বরী থেকে বিকানের এক্সপ্রেস, ১১ বছর পরেও সেই একই নিরাপত্তাহীনতা?



HnExpress সুদীপ্ত কুন্ডু, বিশেষ প্রতিবেদন ঃ পেরিয়ে গেছে ১১টা বছর। ১৩ই জানুয়ারি, ২০২২ এর বিকানের এক্সপ্রেস দুর্ঘটনার স্মৃতি ফের মনে করিয়ে দিলো ২০১০ সালের ১৮ই মে’র জ্ঞানেশ্বরী কান্ড। না, এটা কোনো নাশকতামূলক হামলার জন্য হয়েনি। প্রশ্নটা ফের একবার জেগে উঠেছে, ভারতীয় রেলওয়ের যাত্রী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। হ্যাঁ, এই ১১ বছরে কেন্দ্রীয় সরকারের মসনদে বদল এসেছে অনেকটাই, ঢাকঢোল পিটিয়ে দ্রুত থেকে দ্রুততর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ভারতীয় পরিবহন ব্যবস্থার লাইফলাইনকেও। কিন্তু কোথায় যাত্রী নিরাপত্তা? এখনও সেই একই গা আলগা পর্যায়ে—

ঝারগ্রামের সরডিহা রেল স্টেশনের কাছে ভয়াবহ দুর্ঘটনাগ্রস্থ হয় জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেস। মারা যান ১৪৯ জন যাত্রী। তখন ভারতীয় রেলে ICF অর্থাৎ ইন্টিগ্রেটেড কোচ ফ্যাক্টরী কোচের রমরমা চলছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই, দুর্ঘটনার পর দুমড়ে-মুচড়ে যায় ট্রেনের বগিগুলো। গ্যাস কাটার দিয়ে বগি কেটে বের করতে হয়েছিল ক্ষতবিক্ষত লাশগুলো। হয়তো কিছু মানুষ শেষ সময়টুকু পর্যন্তও বেঁচে ছিলেন, কিন্তু…

২০২২ সালের ১৩ই জানুয়ারী বিকেল ঠিক ৫টা নাগাদ ময়নাগুড়ি রেল স্টেশনের কাছে সেই একই অবস্থার পুনরাবৃত্তির শিকার হলো দুর্ঘটনাগ্রস্ত গুয়াহাটিগামী বিকানের এক্সপ্রেস। সেই একই আইসিএফ কোচ, সেই একইভাবেই দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া কোচগুলো ঢুকে গিয়েছে একটা আরেকটার ভেতর। সেই একই প্রক্রিয়ায় গ্যাস কাটার দিয়ে কোচ কেটে ফেলার যে ধীর প্রক্রিয়া তা চলছে রাতভর, না জানি এখনও কত আহত যাত্রী মৃত্যুর অপেক্ষায় একটু জল খুঁজছেন।



তবে এটা ঠিক যে, ভারতীয় রেলমন্ত্রক কিন্তু দেশের পরিবহনের লাইফলাইনকে আরও দ্রুততর এবং আরামপ্রদ করার পক্ষে, স্টেশন এবং ট্রেনগুলোকে বেসরকারিকরণ করার পক্ষেও। কিন্তু যাত্রী নিরাপত্তা? ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রাক্তন রেলমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল ঘোষণা করেছিলেন, ২০২৪ সালের মধ্যে যাত্রী সুরক্ষার লক্ষ্যে দেশের প্রত্যেকটি দূরপাল্লার ট্রেনকে LHB (লিঙ্ক হফম্যান বুস) কোচ করা হবে। আর দুবছরের মধ্যেই নাকি তা বাস্তবে রূপান্তরিত হবে! কিন্তু বাস্তবে সেই লক্ষ্যমাত্রার ৫০ শতাংশও কি পূরণ হয়েছে? প্রশ্ন আমজনতার—

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে আইসিএফ কোচের উৎপাদন করে দেওয়া হলেও পুরনো ঝরঝরে এই কোচগুলোকেই নতুন হলুদ রঙ করে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে দেদার। দ্রুতগামী ট্রেনের ক্ষেত্রে ICF কোচে মূলত সুরক্ষা ব্যবস্থা অনেকটাই নিম্নমানের। ফলে ট্রেন দুর্ঘটনায় পড়লে তা খুব সহজেই ভেঙে দুমড়ে-মুচড়ে যায়। বুঝতেই পারা যাচ্ছে যে, যাত্রী সাধারণের প্রাণে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকলেও ভেতরে থাকাকালীন তাদের শরীরের কি অবস্থা হয়। কিন্তু ২০০০ সাল থেকে ভারতীয় রেলে ব্যবহৃত এলএইচবি কোচ অ্যান্টি-টেলিস্কোপিক হওয়ায় এবং এতে অ্যাডভান্সড নিউমেটিক ডিস্ক ব্রেক সিস্টেম থাকায় ট্রেন দুর্ঘটনায় পড়লেও তাতে কোনভাবেই কোচগুলো দুমড়ে-মুচড়ে যায় না। ফলে যাত্রী মৃত্যুর সম্ভবনা অনেকটাই কমে যায়।

যদিও এটা বলাই বাহুল্য, রেলের সুরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ হলে টিকিটের ভাড়া বাড়বে নিঃসন্দেহেই, আর সেটাই স্বাভাবিক। জীবনের চেয়েও নিশ্চয়ই টিকিটের মূল্য বড় হতে পারে না। আজ দুর্ঘটনাগ্রস্ত বিকানের এক্সপ্রেসের কোচগুলো এলএইচবি হলে মৃত্যুর সংখ্যা এতটা হতই না। এই দায় কার? উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত তো হবেই, হয়তো লাইনে ফাটল বা ট্রেনেরই কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি বের হয়ে আসবে, কিন্তু যে জীবন দীপ গুলো অকালে আজ নিভে গেল, তার বিনিময়ে শুধুমাত্র দেশের প্রধানমন্ত্রীর ট্যুইট আর রেলমন্ত্রকের দেওয়া এই ক্ষতিপূরণ যথেষ্ট কি? প্রশ্ন আমজনতার—

Leave a Reply

Latest Up to Date

%d bloggers like this: