কেন্দ্রের ‘কালো’ কৃষি বিলের প্রতিবাদে আগামী সোমবার ভারত বনধের ডাক সংযুক্ত কিষান মোর্চার



HnExpress অরুণ কুমার ঃ কেন্দ্রীয় সরকারের ‘কালো’ কৃষি বিলের প্রতিবাদে আগামী সোমবার অর্থাৎ ২৭শে সেপ্টেম্বর ভারত বনধের ডাক দিয়েছে সংযুক্ত কিষান মোর্চা। আর এবার সেই বন্‌ধকেই সমর্থন জানিয়ে কৃষকদের পাশে এসে দাঁড়াল অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি। শনিবার আপের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সংযুক্ত কিষান মোর্চা আগামী সোমবার দেশব্যাপী যে বন্‌ধের ডাক দিয়েছে তা সর্বসম্মত ভাবে সমর্থন করবে আম আদমি দল।

শনিবার এই ভারত বন্‌ধের সমর্থন করে আপের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ‘ক্ষমতাসীন বিজেপি এবং কংগ্রেস দল আমাদের দেশের অন্নদাতার কণ্ঠরোধ করতে স্বৈরাচারী মনোভাব অবলম্বন করছে। খুব শীঘ্রই বিজেপি দলকে এই দমননীতির চূড়ান্ত মূল্য দিতে হবে।’ কেন্দ্রের জনবিরোধী, কৃষক বিরোধী তিনটি কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে আগামী ২৭শে সেপ্টেম্বর ২০২১ দেশ জোড়া ভারত বন্ধের ডাক দিয়েছে সংযুক্ত কিষান মোর্চা।

আর বিদ্যুৎ বিল প্রত্যাহার ও চারটি শ্রম কোড বাতিলের দাবিতে ডাকা আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর এর এই ধর্মঘটকে সমর্থন করেছেন কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন ও শিল্পভিত্তিক ফেডারেশন সমূহ। বিতর্কিত তিন কৃষি আইনের প্রতিবাদে আগামী সোমবার তাই দেশব্যপী ধর্মঘটের ডাক দিল কৃষক সংগঠনগুলি। কৃষকদের সংগঠন সংযুক্ত কিষান মোর্চা এই ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে।

সংগঠনের তরফে এই ধর্মঘটকে সর্বতোভাবে সফল করার জন্য দেশবাসীকে আবেদন করা হয়েছে। কৃষকদের ডাকা এই ধর্মঘটকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে জাতীয় কংগ্রেস। প্রথম থেকেই কৃষি বিলের বিরূদ্ধে হয়ে আসা কৃষক আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছিলেন প্রাক্তন কংগ্রেস সভাপতি তথা কংগ্রেস শীর্ষনেতা রাহুল গান্ধী। কংগ্রেসের তরফে নব নিযুক্ত কৃষক আন্দোলন কমিটির সদস্য দিগ্বিজয় সিংয়ের বক্তব্য, দেশের সব অ-বিজেপি দলগুলির উচিৎ এই ধর্মঘটকে সমর্থন করা।

এ বিষয়ে উল্লেখ করতে হয় যে এর আগে উত্তর প্রদেশের মুজফফরনগরে এই সংযুক্ত কিষান মোর্চার ডাকেই ১৫টি রাজ্যের ৩০০টি কৃষক সংগঠনের প্রতিনিধিরা একত্রিত হন। কৃষক নেতাদের মতে, কেন্দ্রের সরকার অনেক সময়ই বলেছিল যে মুষ্ঠিমেয় কিছু কৃষক নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এই আন্দোলন করছে, এখন তাঁরা এসে কৃষক ঐক্য চাক্ষুস করে যাক। এবং খুব দ্রুত প্রমাণিত হবে জাতী-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ এই আন্দোলনকে সমর্থন করছেন।

রবিবার, সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার তরফে জারি করা এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে “আমাদের এই মহাসংগঠন কেন্দ্রের মোদী সরকার ও রাজ্যের যোগী সরকারকে কৃষক, খেতমজুর ঐক্য ও তাঁদের ক্ষমতা সম্পর্কে অবহিত করবে’। কৃষি আইন এর বিরুদ্ধে যে সমস্ত যুক্তি কাজ করছে তা হল এই— প্রথমত, কৃষি আইনটি হল চুক্তি চাষ। এই আইনে অনেক ভালো কথা বলা থাকলেও আসলে এটা কর্পোরেটদের কাছে কৃষকদের বন্দী করা রাখা।

জমি ও পরিশ্রম কৃষকের কর্পোরেট বীজ, সার, কীটনাশক সহ অন্যান্য বিষয় কর্পোরেটের অধিনে চলে যাওয়া। ফলে কি চাষ হবে তা ঠিক করবে কর্পোরেটরা। ফসল কিনবে কর্পোরেটরা, ফসলের দামও ঠিক করবে কর্পোরেটরা। আর দ্বিতীয়ত, নূন্যতম সহায়ক মূল্য থাকছে না এই বিলে। সরকার ফসল কেনার কোনো চেষ্টাই করছে না। ফলে আগামীদিনে রেশন ব্যাবস্থাও থাকবে না দেশে। সবটা কর্পোরেটদের হাতেই ছেড়ে দেওয়া হবে।



এদিকে রাজ্য সরকার মুখে বিজেপির বিরুদ্ধে বিরোধীতা করলেও এই রাজ্যে লোকের অভাব বলে কৃষক সহায়তা কেন্দ্র বন্ধ রাখছে। ধান কিনছে না। ধানের নূন্যতম সহায়ক মূল্য যেখানে ২১০০ টাকা প্রতি কুইন্টাল সেখানে আমাদের রাজ্যে ১৩০০ টাকা কুইন্টালে ধান বেচতে বাধ্য করা হচ্ছে। এছাড়াও কৃষি আইনের সবচাইতে বিপদজনক আইন হলো নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আইন থেকে কৃষিপন্য গুলি তুলে দেওয়া।

মজুতদারি কালো বাজারী খতম করার পরিবর্তে মজতদারি বাড়ানোর জন্য আইন করা হচ্ছে। তার ফল আমরা হাতেনাতে পেয়েছি। এই বছর তৈল বীজ বেশি উৎপাদন হওয়ার পরও ভোজ্য তেলের দাম আজ প্রায় ২০০টাকা। অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে মজুতদারি কালোবাজারির কারণেই এই ঘটনা ঘটছে। উল্লেখ্য, গত ৫ই সেপ্টেম্বর মুজাফফরনগরের মহাপঞ্চায়েত থেকেই আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর ভারত বন্‌ধ ডাকার কথা ঘোষণা করেছিল সংযুক্ত কৃষাণ মোর্চা।

আর এই বন্‌ধকে সমর্থন করে ইতিমধ্যেই তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে উত্তর প্রদেশের একাধিক সংগঠন। কিষান মোর্চার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে তাদের ডাকা এই বন্‌ধ সমর্থন করছে উত্তরপ্রদেশের টেম্পো এসোসিয়েশন, উকিল অরগানাইজেশন এবং আরও অনেক ছোট, বড় স্বাধীন সংগঠন। কৃষকদের ওপর জোর করে চাপানো কৃষি বিল এবং সেই সঙ্গে দেশ জুড়ে হওয়া মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদেই এই বন্‌ধ সর্বোতভাবেই পালিত হতে চলেছে।

ইতিমধ্যেই উত্তরপ্রদেশে এই বনধকে সফল করার জন্য প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে। বস্তুত উত্তরপ্রদেশের একাধিক জেলায় ছোট ছোট দল বানানো হয়েছে। মোর্চার পক্ষ থেকে দেশের অন্যান্য ছোট, বড় রাজনৈতিক দলগুলোকেও এই বন্‌ধকে সমর্থন জানানোর জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। সংযুক্ত কিষান মোর্চার সদস্য আশিস মিত্তাল এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘ইতিমধ্যেই বহু যুব এবং ছাত্র সংগঠন এই বন্‌ধের সমর্থনে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আমরা চাই দেশের অন্যান্য স্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলিও আগামী সোমবার এই ভারত বন্‌ধের সমর্থনে আমাদের পাশে এসে দাঁড়াক।’

কেন্দ্রীয় সরকারের কৃষি আইনের বিরুদ্ধে এবার দেশ তথা রাজ্য জুড়ে ভারত বনধের পথে কৃষক সংগঠনগুলি। কৃষক সংগঠনগুলোর সম্মিলিত সংস্থা সংযুক্ত কৃষক মোর্চা জানিয়ে দিয়েছে সোমবার সকাল ছটা থেকে বিকাল চারটে পর্যন্ত দেশ জুড়ে বনধ পালিত হবে। কৃষক সংগঠন সংযুক্ত কৃষক মোর্চার তরফে জানানো হয়েছে, শুধু কেন্দ্রীয় সরকারের কৃষি আইনের বিরুদ্ধেই নয়, এলপিজি এবং তৎসহ পেট্রোল-ডিজেলের ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধেও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হবে।

আরও জানানো হয়েছে, এই বনধের আওতায় থাকবে সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দোকান, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। বন্ধ থাকবে সরকারি এবং বেসরকারি পরিবহন ব্যবস্থাও। তবে জরুরি ভিত্তিক বিভাগ যেমন, হাসপাতাল, মেডিকেল স্টোর, ত্রাণ ও উদ্ধার কাজ এবং ব্যক্তিগত জরুরী পরিষেবাকে বনধের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। এদিকে সংযুক্ত কৃষক মোর্চার প্রেস বিজ্ঞপ্তি সূত্রে জানা গিয়েছে, যারা তিনটি কৃষি আইন বাতিল, বিদ্যুৎ (সংশোধনী) বিল, ২০২১ বাতিলের দাবিতে কৃষকদের আন্দোলনকে সমর্থন জানাতে চান তাঁরা যেন এগিয়ে আসে।

এবং স্বামীনাথন সূত্র অনুযায়ী সমস্ত ফসলের জন্য এমএসপি-র আইনি অধিকার প্রদানের জন্য কৃষকদের দাবিকে যারা সমর্থন করতে চার তাঁরাও যেন এগিয়ে আসেন। তাদের এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে দিল্লির আম আদমি পার্টি (আপ), রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) এবং অন্ধ্রপ্রদেশের তেলেগু দেশম পার্টি (টিডিপি) কৃষক সংগঠনগুলির ডাকা এই ভারত বনধে তাদের সবরকম সমর্থন আছে বলে জানিয়েছে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: