শীতের মরশুম শুরু হতেই খেঁজুর গাছের রস সংগ্রহে ব্যস্ত গাছিরা



HnExpress জয়দীপ মৈত্র, দক্ষিণ দিনাজপুর ঃ হিমেল হাওয়া ও হালকা কুয়াশায় দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় এখন শীতের আমেজ চলছে। শীত মৌসুম শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই ব্যস্ত হয়ে উঠেছে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ। শুরু হয়েছে শীতের মধু-খেজুর রস আহরণ। এই রস আহরণে গাছিরাও এখন যাবতীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এই মৌসুমে আবহমান বাংলায় খেজুর রস আহরণ, খেজুর গুড় আর নবান্নের উত্‍সব একটি অতি প্রাচীন ঐতিহ্য। আর খেজুর রসের পিঠা পায়েস বাংলার উপাদেয় খাদ্য তালিকায় এখনও জনপ্রিয়। গাছিরা জানান, বছর জুড়ে অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে থাকলেও শীতকালে চাষিদের কাছে খেজুর গাছের কদর বেড়ে যায়। কারণ এই গাছ থেকেই আহরিত হয় সুমিষ্ট রস।

আর এই রস জ্বালিয়ে ঝোলা গুড়, দানা গুড় ও পাটালি তৈরি করা হয়। খেজুরের গুড় থেকে এক সময় বাদামি চিনিও তৈরি করা হত। যার মৌতানো স্বাদ ও ঘ্রাণ সর্ম্পূণই ভিন্ন। খেজুর গাছের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, যত বেশি শীত পড়বে তত বেশি মিষ্টি রস দেবে। শীতের সকালে খেজুর রস পান শরীর ও মনে প্রশান্তি এনে দেয়, সাথে পেটও ঠান্ডা করে।

খেজুর রস আহরণ আর তার থেকে বিভিন্ন উপাদেয় খাদ্য তৈরি আবহমান বাংলার সংস্কৃতির এক অনুষঙ্গ। খেজুরের নলেন গুড় ছাড়া শীত মৌসুমের পিঠা পায়েস খাওয়া জমে না। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কৃষকরা নতুন ধান সংগ্রহের পাশাপাশি খেজুর রস আহরণের প্রস্তুতিও শুরু করেছে। এখন চলছে খেজুর গাছের ডগা চাছার কাজ।

এরপর চাছা ডগায় বাশের তৈরি বিশেষ নল লাগিয়ে সংগ্রহ করা হবে ফোটায় ফোটায় রস। মাটির হাড়িতে খেজুর রস সংগ্রহ করা হয়। তবে আজকাল প্লাস্টিকের বোতলেও খেজুর রস আহরণ করে থাকে চাষিরা। শীতের পুরো মৌসুম জুড়ে চলবে রস, গুড়, পিঠা-পুলি, পায়েস খাওয়ার পালা। আর কিছুদিন পর নতুন গুড়ের মিষ্টি গন্ধে ধীরে ধীরে আমোদিত হয়ে উঠবে গ্রাম-বাংলা।

দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বাউল এলাকার গাছি মিন্টু বসাক জানান যে, গাছের ডগা চেছে বাশের খিল লাগানোর কাজ চলছে। অল্পদিনের মধ্যেই রস আহরণ শুরু হবে। খেজুর গাছ অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। যদিও এর পরিকল্পিত আবাদ তেমন নেই। উপরন্তু নির্বিচারে খেজুর গাছ কেটেও ফেলা হচ্ছে।

যা পল্লী বাংলার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। খেজুর গাছ থেকে শুধু সুমিষ্ট রস ও গুড়ই হচ্ছে না, প্রকৃতির ভারসাম্য সুরক্ষায় খেজুর গাছের আবাদ সম্প্রসারণ জরুরি। প্রকৃতিতে শীতের আগমনী বার্তা সমাগত। বাঙালির এই সময়ের অন্যতম আকর্ষণ খেজুর গুড়ের পিঠা-পায়েস। প্রাচীনকাল থেকেই খেজুর গুড়ের জন্য গ্রাম বাংলা বিখ্যাত।

দিন বদলের সঙ্গে মানুষের জীবন-যাত্রায় অনেক কিছু বদলে গেলেও বদলায়নি খেজুরের রস সংগ্রহ এবং গুড়-পাটালি তৈরির পদ্ধতি। তাই শীতের আগমনী বার্তা জানান দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এখানকার ‘গাছিরা’ প্রস্তুতি নেন খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের। এই জন্য প্রথমেই খেজুর গাছ কেটে পরিষ্কার করেন তাঁরা।

এরপর শুরু হয় রস সংগ্রহ। চিরাচরিত সনাতন পদ্ধতিতে মাটির ভাঁড়ে (কলসি) রাতভর রস সংগ্রহ করা হয়। সূর্য ওঠার আগেই তা আবার গাছ থেকে নামিয়ে আনে তারা। পরে এই রস মাটির হাঁড়িতে কিংবা টিনের তৈরি কড়াইয়ে জ্বালিয়ে তৈরি করে গুড়-পাটালি। ইতিমধ্যেই জেলার নানান জায়গায় শুরু হয়েছে গুড়-পাটালি তৈরির সেই প্রক্রিয়া।

গাছিরা এখন কাজের ব্যস্ততার মধ্যে সময় কাটাচ্ছেন। অল্প দিনের মধ্যেই বাজারে পাওয়া যাবে নতুন খেজুর গুড়। গ্রামে গ্রামে পড়ে যাবে খেজুরের রস দিয়ে পিঠা, পায়েস সহ নানা মুখরোচক খাবার তৈরির ধুম। শীতের আগমনী বার্তা উৎসবের পাশাপাশি গ্রাম বাংলায় নিয়ে আসে নানা রকম সুস্বাদু খাবারের সমাহারও।

বিভিন্ন রকমের খাবারের মধ্যে গ্রাম বাংলায় শীতের প্রধান অনুষঙ্গ সুস্বাদু খেজুরের রস। সেই রসে তৈরি পাটালি গুড় আর শীতের রকমারি পিঠা-পুলি সবার মন ভরিয়ে দেয়। তাই লোভনীয় খেজুর রসের জোগান দিতে এখন থেকেই ব্যস্ত গাছিরা। চলছে খেজুর গাছ চাছা-ছোলার কাজ। সেসব গ্রামে গিয়ে দেখা গিয়েছে, দল বেঁধে গাছিরা খেজুর গাছ পরিষ্কারের কাজ করছেন।

গাছের বাইগা (ডাল) ঝোড়া, গাছের মাথা ছেনি অথবা ধারালো হাঁসুয়া দিয়ে কয়েক দফা চাঁচ দেওয়ার কাজ চলছে। রস জ্বালানো ভাটি, জ্বালানি ও রসের ঘটি সংগ্রহের কাজ প্রায় শেষের দিকে। আরেক গাছি নীরদ সরকার বলেন, এই গ্রামের খেজুর রস এবং পাটালির যথেষ্ট সুনাম আছে। তাই আমরা আগাম কাজ শুরু করি।

মরশুমের শুরুতেই বাজারে পাটালি গুড় ও খেজুর রস ওঠে গাছিদের আগাম গাছ ঝোড়ার কারণে। বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, কোমরে মোটা রশি বেঁধে ঝুলে ঝুলে খেজুর গাছ ঝুড়ের মাথায় চাঁচ দিচ্ছেন। এই গ্রামের পেশাদার গাছিদের পাশাপাশি গৃহস্থরাও বসে নেই, নিজের গাছ তৈরি করছেন তাঁরা। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বুনিয়াদপুর ও গঙ্গারামপুর এর যথাক্রমে বড়াইল, শেরপুর, শিববাড়ি ও সর্বমঙ্গলা গ্রামের কয়েকজন গাছিরা জানান, কার্তিক মাসের শুরু থেকেই এই খেজুর গাছের পরিচর্যা চলছে।

রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় এখানকার গুড় বিক্রি হয়। জেলার গ্রামীণ মেঠোপথের ধারেই রয়েছে সারি সারি খেজুর গাছ। তাই এই অগ্রহায়নের বিকেলের দিকে গ্রামের যে পথেই হাঁটা যাক না কেন, চোখে পড়বে খেজুর গাছ ঝোড়ার অপূর্ব দৃশ্যটি। অগ্রহায়ণের প্রথম সপ্তাহেই গ্রামের ঘরে ঘরে খেজুর রস আর গুড় দিয়ে নতুন আমন ধানের পিঠা-পুলি ও পায়েশ তৈরির ধুম পড়বে। আসন্ন পৌষপার্বন-পুষনা বা পীঠে-পুলির উত্‍সবে এই খেজুর গুড় ও রস নতুন মাত্রা আনবে গ্রাম থেকে শহরের গৃহস্থদের রসুইখানায়।

Leave a Reply

Latest Up to Date

%d bloggers like this: