স্বাস্থোজ্জ্বল চুলের জন্য দরকারী টিপস, প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় রাখুন কেরাটিন ও বায়োটিন সমৃদ্ধ খাবার



HnExpress নিজস্ব প্রতিনিধি, শরীর-স্বাস্থ্য ঃ আমরা সবাই জানি মানুষের মাথার চুল মুখের সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তুলতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে। সে মহিলা হোক বা পুরুষ। তবে পুরুষদের যতটা না খারাপ দেখায় চুল কমে গেলে, তার চেয়ে অনেক বেশি খারাপ লাগে মহিলাদের চুল না থাকলে। আর এর ফলে বহু মহিলাই ডিপ্রেশনে ভোগেন। কারণ চুল সুন্দর না হলে সৌন্দর্য ঠিক ততটা খোলে না একজন রমণীর ক্ষেত্রে।

আর সঠিক পুষ্টি পেলেই আমাদের চুলের জেল্লা কিন্তু ঠিকঠাক থাকে। আর সেটা না পেলেই চুল রুক্ষ এবং ম্যাড়ম্যাড়ে হয়ে ঝরতে শুরু করে। চুলে খুশকি, চুলকানি সহ নানান সমস্যা দেখা যায়। তাই চুলের পরিচ্ছন্নতা বজায় না রাখলে চুল যেমন পড়ে যায়, ঠিক তেমনই সঠিক ডায়েট মেনে না চললেও কিন্তু চুল পড়ার সমস্যা দেখা দেয়।

স্বাস্থ্যকর খাবার খেলে যেমন আমরা সুস্থ থাকি, ঠিক তেমনি ত্বকও সুন্দর হয় এবং চুলের ওপরেও খাবারের প্রভাব পড়ে ব্যাপকভাবে। শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার-এর পাশাপাশি আপনি কী খাচ্ছেন তাও কিন্তু চুলের জন্য সমান জরুরি! হেয়ার বিশেষজ্ঞরা বললেন, খাবারের পুষ্টিগুণ চুলের প্রধান উপাদান, যা মাথার ত্বকের ওপরে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। আসুন এক নজরে জেনে নেওয়া যাক চুলের জন্য উপকারী কিছু পুষ্টি যুক্ত খাবারের তালিকা।

ডিম ঃ ডিম হলো প্রোটিনের একটি বড় উৎস। এছাড়াও এতে প্রচুর পরিমাণে জিংক, সেলেনিয়াম, সালফার ও আয়রন রয়েছে। আয়রন চুলের গোড়ায় রক্ত ও অক্সিজেনের সরবরাহ নিশ্চিত করে। কারণ আয়রনের অভাবে অ্যানেমিয়া জাতীয় রোগেও নারীদের চুল পড়ে যাওয়া একটি বড় কারণ।

ডাল ঃ ডাল উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, যা আমাদে দেহের কোষ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। এটি চুলের কোষ বৃদ্ধিতে অনেক সহায়তা করে। এতে চুল দ্রুতহারে বাড়ে এবং চুলের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পায়। রুক্ষতা দূর হয়। তাই খাদ্য তালিকায় অবশ্যই ডাল রাখতে বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

সামুদ্রিক জাতীয় মাছ ঃ সামুদ্রিক মাছে থাকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ডি, যা চুলকে করে তোলে শক্ত ও মজবুত। সমুদ্রের প্রায় সব মাছেই রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা চুলের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। সার্টিন মাছ, ট্রাউট মাছ, স্যামন মাছ, টুনা মাছ ইত্যাদিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড। অ্যাভোকাডো ও মিষ্টি কুমড়ার বীজেও রয়েছে প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড।

হাঁস বা মুরগীর মাংস ঃ এসব মাংসে প্রোটিনের উৎস অপরিহার্য। এছাড়াও এতে রয়েছে চুলের স্বাস্থ্য উপযোগী উপাদান, যেমন জিংক, আয়রন এবং ভিটামিন-বি।

পালং শাক ঃ পালং শাকে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন এবং ফোলাইট। এই সবুজ শাকটি নিয়মিত খেলে অ্যানিমিয়া দেহে হিমোগ্লোবিন-এর মাত্রা বাড়ে এবং এতে চুলের ফলিকল-এ অক্সিজেন পৌঁছায়। এতে করে আমাদের চুল দ্রুত বাড়ে এবং মাথার ত্বক সুস্থ থাকে।

গাজর ঃ গাজরেও রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-এ, যা চুলের পক্ষে অত্যন্ত উপকারী। তাই নিত্য দিনের ডায়েটে গাজর রাখলে চুল পড়ার সমস্যায় লাগাম পড়ানো সম্ভব।

পাকা টমেটো ঃ একটি পাকা টমেটোতে আছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা মাথার স্ক্যাল্প-এর রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে দেয়। এর কারণে চুলের ফলিকল স্টিমুলেটেড হয়। একটি পাকা টমেটো দিয়ে জুস বানিয়ে বা কাঁচা টমেটো চিবিয়ে খেয়ে নিন।

আমলকী ঃ আমরা সবাই চুলের যত্নে আমলকীর গুঁড়া ব্যবহার করি। তবে লবণ দিয়ে চার থেকে পাঁচটি আমলকী চিবিয়ে খেলেও চুল পড়া অনেকাংশে রোধ হয়। আমলকীতে আছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন, যা নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে, পাশাপাশি চুল পড়াও রোধ করে। এছাড়া চুল ঘন ও কালো হয়।

শসা ঃ একটি শসাতে আছে যথেষ্ট পরিমাণে সিলিকা, সালফার এবং ভিটামিন-এ। এই উপাদান গুলি চুলের বৃদ্ধি ঘটায় এবং চুল পড়া বন্ধ করে। কাঁচা শসার জুস স্বাস্থ্যকর এবং চুল গজাতে সাহায্য করে। প্রতিদিন খোসাসহ একটি কচি শসা খেলে নতুন চুল গজাবেই।

ক্যাপসিকাম ঃ লাল, হলুদ এবং সবুজ রঙের ক্যাপসিকাম ভিটামিন-সি এর খুব ভালো উৎস। আর ভিটামিন সি চুলের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে এবং চুলের ভঙ্গুরতা দূর করতেও অপরিহার্য। চুলের সুস্থতায় স্যালাদ এবং রান্নায় ক্যাপসিকাম রাখার অভ্যাস করুন।

মটরশুঁটি ঃ চুলের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় একটি উপাদান হলো কেরাটিন। মটরশুঁটি ও ডালে পর্যাপ্ত পরিমাণে এই প্রোটিন সমৃদ্ধ। শক্তপোক্ত চুলের জন্য নিয়মিত মটর ও মটরডাল খেতে পারেন। এতে চুলের বৃদ্ধি যেমন হবে, তেমনি চুল থাকবে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল ও ঝলমলে।

বাদাম ঃ বাদামে বায়োটিন উপাদান আছে, যা চুল দ্রুত বৃদ্ধি করে চুলের গোড়াকে মজবুত করে থাকে। কাজু বাদাম, কাঠ বাদাম, চিনা বাদাম, পেস্তা বাদামে পর্যাপ্ত পরিমাণে পরিমাণে বায়োটিন আছে। প্রতিদিন খাদ্য তালিকায় তাই এক কাপ করে বাদাম রাখুন। আর কয়েক মাসের মধ্যেই আপনি আপনার চুলের পরিবর্তন দেখতে পাবেন।

আখরোট ঃ আখরোটে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, বায়োটিন এবং ভিটামিন-ই।যা চুলের কোষগুলোকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচায়। আখরোট চুলের প্রতিরক্ষক হিসেবে কাজ করে। আর এছাড়াও আখরোটে রয়েছে তামা, যা আপনার চুলের প্রাকৃতিক রং ধরে রাখতে সাহায্য করে। চুলের যে ঝলমলে ভাব, তা ধরে রাখতেও আখরোট সহযোগিতা অপরিহার্য।

লেবু ঃ শরীরে প্রতিদিন ভিটামিন সি-এর চাহিদা পূরণে লেবু, কমলালেবু বা এই জাতীয় ফল খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে। লেবু ভাতের সাথে অথবা জলে মধু মিশিয়ে খাওয়া যেতে পারে। দ্রুত চুল গজাতে এটি অনেক বেশি কার্যকরী।

পেয়ারা, পেঁপে ও কমলালেবু ঃ এই সব ফলে রয়েছে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন-সি। ভিটামিন-সি চুলের গোড়ায় রক্ত সঞ্চালন করার কাজে সহযোগী। এছাড়াও কৈশিক-জালিকা বা সরু রক্তনালীকে পরিশুদ্ধ করতে সহায়তা করে। যা চুলের ডগা ভেঙে যাওয়াকে প্রতিরোধ করে।

অ্যাভোকাডো ঃ অ্যাভোকাডোতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন বি ও ই এবং ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে। যা চুলের আগা ফাটা ও চুল পড়া রোধ করে। এর সাথে চুলের গোড়া মজবুত করে তোলে।

নাশপাতি ঃ সুন্দর চুল, শরীরে রক্তের প্রবাহ ঠিক রাখা, রক্তে পিএইচ–এর মাত্রা ঠিক রাখা, এসবে নাশপাতির জুড়ি নেই। তাই সকালের জলখাবারে অথবা দিনের যে কোনো সময় এটা খেতে পারেন।

ব্লুবেরি ঃ ব্লুবেরি আমাদের দেশে খুব বেশি পরিচিত ফল না হলেও, এই ফলটি চুলের জন্য খুব উপকারী। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, যা চুলের পুষ্টির জন্য খুবই জরুরি। এটি মাথার ত্বকের রক্তের সঞ্চলন ঠিক রেখে চুলে পুষ্টি যোগায়। ভিটামিন সি-এর অভাব দেখা দিলেই চুল রুক্ষ ও ভঙ্গুর হয়ে যায়। এছাড়া কিউই ও স্ট্রবেরিতেও প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি রয়েছে।

মিষ্টি আলু ঃ মিষ্টি আলু ভিটামিন-এ ও মাথার ত্বকে প্রয়োজনীয় তেল তৈরিতে সাহায্য করে। ভিটামিন এ -এর অভাব দেখা দিলে মাথার ত্বকে চুলকানি ও খুশকির মতো সমস্যা দেখা হতে পারে। গাজর, আম, মিষ্টি কুমড়া, অ্যাপ্রিকট ও বাঙ্গিও ভিটামিন এ -এর চমত্‍কার উত্‍স।

অ্যালোভেরা ঃ অ্যালোভেরায় থাকা অ্যামাইনো এসিড, প্রোটিন, মিনারেল ও ভিটামিন, বিশেষ করে এ, সি ও ই ক্ষতিগ্রস্ত চুলের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। অ্যালোভেরার পাতার ভিতরের শাঁস দিয়ে শরবত বানিয়ে বা কেনা অ্যালোভেরা জুস খেতে পারেন।

শস্যদানা ঃ বায়োটিনে থাকে আয়রণ, জিংক এবং ভিটামিন। বায়োটিন সেল গঠনে এবং অ্যামাইনো এসিড তৈরিতে ভূমিকা রাখে, যা সুন্দর চুলের জন্য আবশ্যক। তাই শস্যদানা খেয়ে বায়োটিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।

পনির, দুধ ও দুগ্ধ জাতীয় খাবার ঃ দুগ্ধ জাতীয় এসব খাবারে আছে প্রোটিন, ভিটামিন বি-৫ এবং ভিটামিন-ডি। আধুনিক গবেষণা প্রমাণ করে যে, ভিটামিন-ডি চুলের গোড়ার সঠিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে সাহায্য করে থাকে।

ওটস ঃ ওটসে রয়েছে প্রোটিন, তামা, দস্তা ও ভিটামিন বি-এর মিশ্রণ। প্রাতঃরাশে ওটস খেলে চুল পড়াও কমবে, শরীরও ভালো থাকবে। এটি একটি দরকারী ও প্রয়োজনীয় উপাদান।

তাই স্বাস্থ্যোজ্জ্বল চুল পেতে হলে জল-তেলের পরিচর্যা তো চাই, সঙ্গে চাই প্রয়োজনীয় পুষ্টিযুক্ত খাবার। চুল যদি শরীর থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগাড় করতে না পারে, তা হলে মাথায় কেবল তেল মেখে আর শ্যাম্পু করে চুল ঠিকঠাক রাখা যায় না। তাই সর্বদা স্বাস্থকর খাবার খান ও চুলের যত্ন নিন।

Leave a Reply

Latest Up to Date

%d bloggers like this: