স্বাস্থ্যবিধিকে তোয়াক্কা না করায় প্রাণ দিয়ে তার মাশুল গুনছেন বরানগরবাসী

HnExpress ২২শে জুলাই, ঝুম্পা দেবনাথ, প্রতিনিধি, বরানগর ঃ প্রতিদিন প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে করোনার রেকর্ড সংক্রমণ। আর প্রতিদিনই করোনা সংক্রান্ত নানা তথ্য বৈদ্যুতিন যন্ত্রের মাধ্যমে দেশের সকল প্রান্তের মানুষের কাছে পৌঁছেও দেওয়া হচ্ছে। সাথে বারংবার সকলকে অনুরোধ করা হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে। কিন্তু স্বাস্থ্যবিধিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অনেকেই মাস্ক না পড়ে, সামাজিক দূরত্ব বজায় না রেখে অসর্তকতার পরিচয় দিচ্ছেন। যার ফল স্বরূপ, সেই স্বাস্থ্যবিধিকে তোয়াক্কা না করায় প্রাণ দিয়ে তার মাশুল গুনছেন বরানগরবাসী।

দিনের পর দিন সকলের অজান্তেই শরীরে প্রবেশ করছে মারণ ব্যাধি করোনা। স্বাস্থ্য দফতর সুত্রে জানা গেছে, ২৪ ঘন্টায় একদিনে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৪২ হাজার ৪৮৭ জন। রাজ‍্যে কোভিড-১৯ থাবা বসিয়েছে ২২৭৮ জন মানুষের শরীরে। অন্যদিকে দেশে এই করোনাকে জয় করে ফিরেছেন ২৪,৮৮৩ জন মানুষ। দেশে মোট করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ১১ লক্ষ ১৮ হাজার ৩৩ জন‌। এছাড়াও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানাচ্ছেন এবছরে শীতে করোনার সংক্রমণের দিক থেকে ভারতের স্থান থাকতে পারে সর্বোচ্চ শীর্ষে।

এমতাবস্থায় রাজ‍্যে করোনা ভাইরাসের বিপুল সংক্রমণকে রুখতেই কলকাতা, উওর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলী, সহ নানা জেলাগুলোতে একাধিক সংক্রমিত এলাকাকে কনটেনমেন্ট জোন হিসাবে চিহ্নিত করে ৩১ শে জুলাই পযর্ন্ত লকডাউন ঘোষণা করেছিলেন মুখ‍্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এদিকে বরানগর অঞ্চলে প্রবল সংক্রমণের দিক দিয়ে চিহ্নিত হওয়া কনটেনমেন্ট জোন গুলিতে পুলিশ-প্রশাসন ত‍ৎপরতার সাথে বাঁশের ব‍্যারিকেড দিয়ে আটকে দিয়েছিলেন সেই সকল ব‍্যস্ততম রাস্তাগুলিকে।

পুরসভা দায়িত্ব নিয়ে সকাল হলেই কনটেনমেন্ট জোনগুলিতে কাউকে নিতান্তই দরকার ছাড়া বাইরে না বেরোনোর জন্য মাইকিং-র মাধ্যমে প্রচার করছেন। কিন্তু বরানগরবাসী এইসব সতর্কতার কোন কিছুকেই তোয়াক্কা না করেই বাঁশের ব‍্যারিকেড খুলে ফেলে স্বাভাবিক দিনের মতোই স্কুটার, সাইকেল, বাইক নিয়ে দৌড়াছেন গন্তব্যস্থলের দিকে। আবার কেউ কেউ সকাল হতেই বাজারের থলি হাতে খোস মেজাজেই বেরিয়ে পড়ছেন বাজার করতে। তাই স্বভাবতই সামাজিক দূরত্ব শিকেয় উঠছে।

আবার কেউ কেউ মাস্ক নাকে মুখে ঢাকার জন্য ব‍্যবহার না করে গলায় বা থুতনিতে ঝুলিয়ে রাখছেন। এই সমস্ত অসর্তকা থেকেই স্বাভাবিক ভাবেই বাদ যায়নি বরানগরের ১৭নং ওয়ার্ড এর বাসিন্দারাও। ফলত খেসারত হিসাবে করোনার প্রভাবে অকালেই প্রাণ হারাচ্ছেন বরানগরবাসী। সদ‍্য কয়েকদিন আগেই বরানগরের এই ১৭ নং ওয়ার্ডে জ্বর নিয়ে দোকান খুলেছিলেন এক মুদিখানা ব‍্যাবসায়ী। কিন্তু ঝিমনি থাকায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তাঁর মৃত্যু পর করোনার রিপোর্ট পজিটিভ আসে।

মৃতের ছেলে করোনার জন্য হাসপাতালে ভর্তি এবং তাঁর মা শয‍্যাশায়ী, যদিও মৃতের মায়ের করোনা রিপোর্ট পজিটিভ এলে যে কি হবে এই নিয়ে সকলেই উদ্বিগ্ন, আবার অনেকেই ভাবছেন এদিন কারা কারা এই মুদি ব‍্যাবসায়ীর সংস্পর্শে এসেছিলেন। এই নিয়ে মুদি ব‍্যাবসায়ীর এই সদ‍্য মৃত্যুকে ঘিরে বরানগর অঞ্চলের সকলের মধ্যে চাঞ্চল্যতা চোখে পড়লেও এখনো মাস্ক না পড়ে স্বাস্থ্যবাধি লঙ্ঘন করে অসর্তকতার পরিচয় দিচ্ছেন অনেকেই। পুরসভা, পুলিশ সহ সিভিক পুলিশরা বারন করেও সর্তক করতে পারছেন না বরানগরবাসীকে।

এদিন সাংবাদিক বৈঠকে বাংলার স্বরাষ্ট্র সচিব আলাপন বন্দ‍্যোপাধ‍্যায় জানান, কেরালার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গেও শুরু হয়ে গেছে গোষ্ঠী সংক্রমণ। আর তাই এই সংক্রমণকে রোধ করার জন্য রাজ‍্যে সপ্তাহে ২ দিন করে সম্পূর্ণ লকডাউন করা হবে। তিনি আরও বলেন এই সপ্তাহে বৃহস্পতিবার ও শনিবার লকডাউন করা হচ্ছে এবং পরের সপ্তাহে শুধুমাত্র বুধবার দিনটা এখনো পযর্ন্ত ঠিক করা হয়েছে লকডাউন করার জন্য। এবং পরের সপ্তাহে দ্বিতীয় দিনটি সোমবার বৈঠকে বসে ঠিক করা হবে বলে সুত্রের খবর।

এদিন তিনি আরও জানান, এই ভাবে পুরো আগস্ট মাস পর্যন্ত যদি লকডাউন করা যায়, তাহলে গোষ্ঠী সংক্রমণকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে বলে মনে করছি। বরানগর অঞ্চলে করোনা সংক্রমণকে ঘিরে প্রশাসক মন্ডলীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরো চওড়া হচ্ছে। এই অবস্থায় পশ্চিমবঙ্গের পরিকল্পনা মন্ত্রী তথা বরানগর বিধানসভার বিধায়ক তাপস রায়ের নিজ উদ্যোগে কোভিডের মতো অতিমারীর হাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে এবং মানুষকে সঠিক পরিষেবা দেওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৫ জনের পরবর্তী ২০জন করে করোনা পরীক্ষার ব‍্যাবস্থা শুরু করা হয়েছে বরানগর জেনারেল হাসপাতালে।

পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী তথা বরানগর বিধানসভার বিধায়ক তাপস রায়ের এই অভাবনীয় প্রয়াসে রোগীর পরিবার সহ বরানগরের সাধারণ মানুষ সকলেই যারপরনাই খুশি। তাছাড়াও তিনি আরও বললেন যে, মানুষের জন্য সর্বদাই কাজ করি এবং ভবিষ্যতেও কাজ করে যাব। তিনি আরও বলেন, এই কঠিন পরিস্থিতিতে সকলেই যদি এগিয়ে আসেন, তাহলেই এই কঠিনতম পরিস্থিতির হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। শুধু পুরসভা বা পুলিশ-প্রশাসন নয়, স্বাস্থ্য বিধি মেনে সম্পূর্ণ লকডাউনের ব‍্যাবস্থা গ্ৰহণের মাধ্যমে এগিয়ে আসতে হবে বরানগরবাসীকেও, এমনটাই মনে করেন তিনি।

দিনে দিনে যে ভাবে বরানগর অঞ্চলের মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন, সেই সংক্রমণকে ঠেকাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এক অভাবনীয় উদ্যোগ গ্ৰহণ করা হলো। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয় আগামী ২২ শে জুলাই থেকে বরানগর অঞ্চলে কড়া লকডাউন কার্যকর হবে। সকাল ১১ টা পর্যন্ত খোলা থাকবে সব্জি বাজার ও মাছ বাজার। সকাল ১১ টার পর খোলা যাবে না কোন দোকানপাট, বি.টি.রোড, জি.এল.টি. রোড এবং পি.ডাবলু.ডি. রোড বাদ দিয়ে কোনো রকম অটো, টোটো, চালানো যাবে না।

শুধু মাত্র ওষুধের দোকান, হাসপাতাল, নার্সিং হোম, দুধ ও গ‍্যাসের স‍রবারহ করা যাবে বলেই জানানো হয় প্রশাসনের তরফ থেকে। আরও জানানো হয়, অত্যন্ত জরুরি অবস্থা ছাড়া বাইরে বেরোলে লকডাউন ভঙ্গের অপরাধে আইনত কঠোর ব‍্যাবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসকমন্ডলীর অন‍্যতম প্রধান অর্পনা মৌলিক এদিন সংবাদ মাধ্যমকে জানান, লকডাউন কার্যকর করার ক্ষেত্রে শুধু মাত্র পুরসভা ও পুলিশকে এগিয়ে আসলেই হবে তা নয়, বরানগরবাসীকেও এই লকডাউন সফল করার জন্য লকডাউনের নিয়মবিধি মেনে চলতে হবে।

অন্যদিকে, বিরোধী মহল এই করোনা সংক্রমণ বাড়ার জন্য দায়ী করছেন রাজ্য সরকারকেই। উত্তর কলকাতা ও শহরতলির বিজেপি নেতা কিশোর কর জানান, এই সরকার শুধু মাইকের সামনে ভুল তথ্য প্রচার করতে পারে, এছাড়া আর কিছুই পারে না। তিনি আরও বলেন যে, মহারাষ্ট্র সংক্রমণের সংখ্যা শীর্ষে, তা সত্ত্বেও দারুণ স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলছে স‍রকার, কিন্তু আমাদের পশ্চিমবঙ্গ সরকার ব‍্যর্থ, এমনটাই বক্তব্য তাঁর। বরানগর বিধানসভার বিধায়ক তথা পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী তাপস রায়ের উদ্যোগে বরানগর হাসপাতালে প্রতিদিনের গড়ে ২০ জন মানুষকে করোনা পরীক্ষার ব‍্যাবস্থাকে তিনি সাধুবাদ জানান।

আর এই পরিকল্পনাকে নিয়ে তিনি বলেন যে, বরানগর যে পরিমাণ বিপুল জনবসতি সেখানে তিনি এই ২০ জন করে করোনা পরীক্ষাকে কিছুই নয় বলেই মনে করেন। বরং তিনি মনে করেন প্রতহ্য ১০০ জন করে করোনা পরীক্ষা করা হলে তবেই বরানগরের এই অতি করোনা সংক্রমণকে ঠেকানো যাবে। তবে শুধু পরীক্ষা করলেই তো হবে না, পরীক্ষার রিপোর্ট পজিটিভ হলে যাতে চিকিৎসাও পায় মানুষ সে দিকেও নজর রাখতে হবে বলে জানান তিনি।

আর অপরদিকে সিপিএম জেলা কমিটির সদস্য সানু রায় জানান যে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে বরানগর অঞ্চলে আবারও এই লকডাউনের উদ্যোগ আর ভাবনার তিনি ভূয়সী প্রশংসা করেন। তবে শুধু লকডাউন করলেই তো হবে আর না, বরানগরবাসী যাতে সেই লকডাউনের বিধিনিষেধ সম্পূর্ণ মেনে চলে সেই দিকেও পুরসভা ও পুলিশকে নজর রাখার কথাও বলেন তিনি।

Leave a Reply

%d bloggers like this: