SSC-র অনশনের কান্না এখন জাতীয় ইস্যু

HnExpress সাবির হোসেন হালদার, কলকাতা ঃ গোটা বাংলাজুড়ে যখন লোকসভা ভোটের মহড়া উৎসব চলছে, ঠিক তখনই ফাল্গুনের কাঠফাটা রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে টানা ২৪-২৫ দিন ধরে চাকরির দাবিতে অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন SSC চাকরির প্রার্থীদের একাংশ৷ নিজেদের দাবি ছিনিয়ে আনতে রাজপথ আঁকড়ে অনশনে বসেছেন কমপক্ষে ৩৫০ জন চাকরিপ্রার্থী৷ চাকরির দাবিতে টানা অনশনের খবর এখন বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছে গিয়েছে জাতীয় রাজনীতির আঙিনায়৷ কিছুটা বিলম্বিত হলেও আজ সর্বভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে বাংলার চাকরিপ্রার্থীদের যন্ত্রণাময় কান্নার৷ আর সুত্রের খবর অনুযায়ী, এতেই ভোটের মুখে চূড়ান্ত বিড়ম্বনায় পড়েছে বাংলার শাসক দল!’

কিন্তু, আজ কেন এই বিড়ম্বনা? পর্যবেক্ষক মহলের একাংশের ধারনা, বাংলার উন্নয়নকে মডেল করে লোকসভা নির্বাচনে নেমেছেন বাংলার মা মাটি মানুষের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল৷ এবারের প্রচারে নোটবন্দি, জিএসটি, এনআরসির বিরোধিতাসহ বাংলার কর্মসংস্থানকে হাতিয়ার করে ভোটের প্রচার শুরু করেছে তৃণমূল কংগ্রেস৷ নোটবন্দির প্রভাবে যখন গোটা দেশে এক কোটিরও বেশি কর্মসংস্থান নষ্ট হয়েছে, তখন বাংলায় নাকি মাত্র ৪০ শতাংশ বেকারত্ব কমেছে বলে দাবি করেন আসছেন মুখ্যমন্ত্রী৷ বাংলার উন্নয়ন তুলে ধরে জাতীয় রাজনীতিতে নিজের দখল প্রমাণেরও চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন তিনি৷ কিন্তু, উন্নয়নের বাংলায় চাকরির দাবিতে রাজপথে সফল চাকরির প্রার্থীদের টানা ২৫ দিনের এই অভুক্ত অনশন এখন গোটা দেশের কাছে বিস্ময় হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ সৌজন্যে জাতীয় সংবাদ মাধ্যম৷

আজ একাধিক জাতীয় সংবাদমাধ্যমে রাজ্য সরকারকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হচ্ছে৷ এমনকি, সরকারের পছন্দের সংবাদমাধ্যমেও ভিডিও সহ চাকরির প্রার্থীদের অনশনের খবর তুলে ধরা হয়েছে৷ তবে পর্যবেক্ষক মহলের ধারনা, ভোটের মুখে জাতীয় সংবাদমাধ্যমে বাংলার চাকরির প্রার্থীদের এই কর্মসূচি বেশ কিছুটা ব্যাকফুটে ফেলে দিয়েছে শাসক দলকে৷ কেননা, এবারের লোকসভা নির্বাচনে রাজ্য সরকারের প্রধান ইস্যু যখন কর্মসংস্থান, তখনই বাংলার চাকরির প্রার্থীদের অনশন ভোটের মুখে তৃণমূলের উন্নয়নের বিজ্ঞাপনে কিছুটা হলেও বাধা প্রাপ্ত করেছে বলেই মনে করা হচ্ছে৷ আর তাই এই ইস্যুকেই হাতিয়ার করে ভোটের মঞ্চ কাঁপাতে শুরু করেছে বিজেপি সহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলি৷ একদিকে বাংলা সহ জাতীয় স্তরের সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ ও শঙ্খ ঘোষ সহ বুদ্ধিজীবী মহলের সমালোচনা দিনে দিনে অস্বস্তি বাড়িয়ে তুলেছে শাসক শিবিরের৷

পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী বার তিনেক চেষ্টা করলেও তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে৷ স্কুল সার্ভিস কমিশনের তরফ থেকেও উদ্যোগ নেওয়া হলেও মূল্ সমস্যার সমাধান হয়নি আজও৷ একাংশের মতামতে, এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে ভোটের মুখে বিড়ম্বনা বেড়েছে শাসক শিবিরের৷ শাসকদলের অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে এসএসসি চাকরির প্রার্থীদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে এবার যুবছাত্র অধিকার মঞ্চের প্রতীকী, অনশনে বসেছেন মন্দাক্রান্তা সেন, সুভ্রা চক্রবর্তী ও সামিতা ব্যানার্জি৷ চাকরির প্রার্থীদের অনশনে বসেই মন্দাক্রান্তা সেন জানিয়ে দেন, চাকরির প্রার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি তাঁদের সঙ্গে অনশন করবেন, যতদিন না সরকারি ভাবে এর কোনো প্রতিকার হয়ে৷ এছাড়াও পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার পক্ষ থেকে বহু সোশ্যাল গ্রুপ।

SSC চাকরির প্রার্থীদের দাবিকে পূর্ণ সমর্থনও জানান তাঁরা৷ এদিন তাঁরা প্রশাসনকে সরাসরি কটাক্ষ করে বলেন “আজ ২৫ দিন ধরে যোগ্য চাকরির প্রার্থীরা অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন৷ রাস্তায় পড়ে থেকে, না খেয়ে অভুক্ত অবস্থায়, বাঁচা মড়াকে উপেক্ষা করে ন্যায্য অধিকারে চাকরি চাইছেন সফল পরীক্ষার্থীরা৷ এর পরেও কি প্রচারে বেরিয়ে ভোট চাইতে লজ্জা করবে না নেতাদের? জানি না, সরকার আদৌ কিছু করবে কি না। তবে সরকারের সদিচ্ছাই আমাদের একমাত্র কাম্য।” এর আগে গত বুধবার চাকরিপ্রার্থীদের ডাকা গণকনভেনশনে যোগ দিয়ে কবিতার মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে মৌন যুদ্ধ ঘোষণা করেন তিনি৷

সুরঙ্গমা ভট্টাচার্য এর অভিজ্ঞতার বিবরণ, আজ গিয়েছিলাম ছেলেমেয়ে গুলোর কাছে। এত দীপ্তি এদের চোখেমুখে। এত প্রত্যয়ী চোখ মুখ বহুদিন দেখিনি। সেই আমাদের ছোট কালে ছাত্র আন্দোলনের দিনগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠলো। সেই আমাদের হার না মানা দিনগুলোর কথা। কোনও প্রলোভনে পা দেবার কথা ভাবনার পরিধিতেও ছিল না কোনওদিন।কোনও অন্যায় দেখলে জ্বলে উঠত চোখ। হাত হত মুষ্ঠিবদ্ধ। এখনও রক্ত কেমন চলকে ওঠে অন্যায্য অন্যায় আস্ফালন দেখলে। আমাদের চোখের সামনেই একটি মেয়ে অসুস্হ হয়ে পড়লেন। ছুটে এলেন একজন ইয়ং ডাক্তার।যাদের আন্দোলনের সময়ও ছুটে গিয়েছিলাম আমরা। সেই অনিরুদ্ধ, কুশল, রাতুলরা এসে দাঁড়িয়েছেন ওদের পাশে। নিয়মিত চেক আপ, ওষুধ, ওআরএস দিচ্ছেন ওঁরা। কি অসহনীয় নোংরা পরিবেশের মধ্যে অবস্থান করছেন ওঁরা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। জানা গেল এই ছেলেমেয়েদের অবস্থানমঞ্চ থেকেও চুরি যাচ্ছে নিজেদের জিনিষপত্র। বার বার থানায় জানিয়েও পাননি পুলিশ প্রোটেকশান।

আজ অনেক মহিলারা এই অবস্থানে সামিল, সেইজন্যও বারবার জানিয়েও মেলেনি মহিলা পুলিশ। এদিন মঞ্চে এসেছিলেন অনেকেই। কংগ্রেসের প্রদীপ ভট্টাচার্য, সিপিএম এর অনাদি সাহু সহ এপিডিআর, এসইউসিআই এর অনেক নেতা কর্মীরাই। ডিআইএফআই এর বহু কর্মীও ওদের সঙ্গে নিয়মিত পাহারাদার হিসেবে রাত দিন পালা করে থাকছেন। কংগ্রেসের গ্রিভান্স সেল এর এক নেতাকে বারবার মেয়েদের একটি ঠিকঠাক শৌচালয় ব্যবহার করতে দেবার জন্য ডিসি সাউথকে ফোন করতে দেখা গেল। তিনি খেলার মাঠে থাকার জন্য নাকি ফোন পাওয়া যাচ্ছে না তাঁর। আজ বহুদিন পর এসেছিল কিছু মিডিয়া। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা এসএসসিতে এমপ্যানেল্ড এই ছেলে মেয়েগুলোর পাশে আছি আমরা। তাঁরা আরও জানালেন শিক্ষামন্ত্রীর লোকজন এসে বারবার বলে গেছেন যে তাঁরা নাকি অযোগ্য সৈনিক। তবে আইন দেখাচ্ছেন ঘটা করে। অপমান করেছেন বারংবার। কোর্টেও গেছেন এই আন্দোলনকারীরা। আর দুর্নীতির অভিযোগও এনেছেন এঁরা রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে।

তাই সকল জ্ঞান বিতরণকারীদের কাছে একান্ত অনুরোধ, দয়া করে আমরা কিছু পারি না পারি এঁদের প্রত্যয়কে খাটো করে বড় বড় উপদেশ দেবেন না। এঁদেরকে এঁদের মত করেই বাঁচতে দিন। তাঁরা অভিযোগগুলি প্রমাণসহ আজ মিডিয়াকে দিয়েছেন। স্বচ্ছতার সঙ্গে সরকার লিখিত অনুমোদন দিলেই তাঁরা অনশন তুলবেন বলেও জানিয়েছেন অনশনকারীরা। অনেক ত্যাগ ও প্রত্যয় আজ তাঁদের এই ২৫দিনের লড়াই এর পুঁজি। ইতিমধ্যেই দুই আন্দোলনকারী হারিয়েছেন তাঁদের গর্ভের ভ্রুণকে। আওয়াজ উঠেছে সমগ্র শিক্ষক সমাজ যদি হবু শিক্ষকদের এই আন্দোলনকে মান্যতা দিতে এক হয়ে পাশে থাকেন তাহলে অনশনকারীদের এই আন্দোলন সফল হতে পারে। এখন দেখার সরকার কি করে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই চাকরির পরীক্ষাটা হয় ২০১৬ সালে। তারপর ২০১৭ সালে ২৭ নভেম্বর একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে শিক্ষক নিয়োগের এক মেধাতালিকা প্রকাশিত হয়৷ ১২ই মার্চ, ২০১৮ সালে নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষক নিয়োগের মেধাতালিকা প্রকাশ করে কমিশন৷ কিন্তু, তারপর থেকেই চাকুরির প্রার্থীদের বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় বলে ধর্না মঞ্চের অনশনরতদের অভিযোগ৷ আচার্য সদন ও বিকাশ ভবনে ডেপুটেশন দিয়েও কোনও লাভ হয়নি বলে তাদের দাবি৷

এছাড়াও চাকরির প্রার্থীদের দাবি, পরীক্ষা দিয়ে সফল হওয়ার পরও তাঁদের ওয়েটিং প্রার্থীর তালিকায় রাখা হয়েছে৷ যদিও পরীক্ষা নেওয়ার আগে স্কুল সার্ভিস কমিশনে একটি গেজেট বার করে৷ যেখানে বলা হয়েছিল, গেজেট অনুযায়ীই পরীক্ষা হবে এবং নিয়োগ হবে। কিন্তু, রেজাল্ট বের হওয়ার পর ওই গেজেটে উল্লিখিত প্রত্যেকটা নিয়ম লঙ্ঘন করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়৷ তার মধ্যে আছে, ১:১:৪ রেশিও মেনে ওয়েটিং লিস্ট তৈরি হয়৷ অর্থাৎ ১০০টা শূন্যপদ থাকলে সেখানে ওয়েটিং লিস্টে থাকবেন ৪০ জন৷ কিন্তু দেখা যাচ্ছে ১০০টা শূন্যপদের জন্য ওয়েটিংয়ে রাখা হয়েছে প্রায় ৫০০, ৬০০, ৭০০ জনকে। আর এই কারণেই যে সমস্যা অঙ্কুরেই বিনাশ করা যেতো আজ তা মহীরুহে পরিণত হয়েছে। তবে সব কিছুর পরিশেষে মৃত্যুর সাথে লড়াই করে আজও আশার আলো দেখার অপেক্ষায় দিন গুনছে “ওরা”, “আমরা”, সবাই।

Leave a Reply

Latest Up to Date

%d bloggers like this: