কোভিডের থাবায় বাড়ছে সংক্রমণ থেকে লকডাউন; ছেদ ধরছে বাঙালির আনন্দের শ্রেষ্ঠ দূর্গ্গোৎসবে

HnExpress ২৩শে জুলাই, ঝুম্পা দেবনাথ, সামাজিক ঃ দুর্গাপূজোর নাম শুনলেই বাঙালির মন আনন্দে নেচে ওঠে। কাশ ফুলের গন্ধ, ঢাকের শব্দ, ছোটদের নতুন জামা কেনার হিড়িক সব মিলিয়ে ঘরের মেয়ে উমার বাপের বাড়ি ফেরার আনন্দে প্রতিবছরই সকলে মেতে ওঠেন উৎসব রঙে। কখনো বড়ো প্রতিমা, আবার কখনো সোনার দুর্গা, এ সমস্ত কিছু নিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন ছোট বড় পুজো কমিটির উদ্যোক্তারা। কিন্তু ২০২০-র কোভিডের থাবায় বাড়ছে সংক্রমণ থেকে লকডাউন, ফলে ছেদ ধরছে বাঙালির আনন্দের শ্রেষ্ঠ দূর্গ্গোৎসবে।

বস্তুত এই সময় মানে আগস্ট-সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়ে যায় নতুন জামা-জুতো-ব‍্যাগ কেনা। প্রতিবছর এসময় নানা দোকানে মানুষের ভিড় জমে যায়। সব মিলিয়ে মনে হয় মা উমাকে চারটে দিন কাছে পাওয়ার আনন্দে মর্ত‍্যবাসী যেন প্রতিবছর নতুন করে নতুন রূপে সেজে ওঠে সাজ-সাজ রবে। কিন্তু এই বছর তো করোনা ভাইরাসের কালো ছায়া বাংলার আকাশ বাতাসকে যেন গ্ৰাস করে ফেলেছে। দুর্গাপূজোর আর ১০০ দিন বাকি থাকলেও কারোর মনে নেই কোন আনন্দ, নাক এখন কাশফুলের গন্ধ পাওয়ার বদলে মাস্কে আবৃত।

এবছর মর্ত‍্যবাসী দুর্গাপূজোর আনন্দকে ভুলে করোনার সংক্রমণের গ্ৰাফ কতটা উর্ধ্বমুখী হল, সেইসব খবরের দিকেই চোখ রাখছেন সকলে। দিনে দিনে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমশই বেড়ে চলেছে। বর্তমানে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যাগরিষ্ঠ এর দিক দিয়ে ভারত তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে। প্রতিদিন করোনার সংক্রমণের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে সকলেই আনন্দের হাসি মুখ ঢাকছেন মাস্কের আড়ালে‌, আর হাতে কয়েক ফোঁটা স্যানিটাইজার। স্বাস্থ্য দফতরের দেওয়া বুলেটিন থেকে জানা গেছে, ভারতে মোট সংক্রমণ প্রায় ১২ লক্ষ ছুঁই ছুঁই।

করোনার প্রভাবে মৃত্যুর দিক দিয়ে ভারত বিশ্বের মধ্যে সপ্তম স্থানে উঠে এসেছে। ফলে এবছর কুমোরটুলির শিল্পীকলাদের হস্তশিল্পের চিত্রটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। গত বছরগুলিতে ঠাকুর গড়ার আনন্দে মুখে হাসির ঝলকানি চোখে পরা মুখগুলি যেন আজ করোনার দরুন ঘন কালো কুয়াশায় ঢেকে গিয়েছে। আগমনীর আগমনের আগেই বিসর্জনের বিষাদ ছায়া ঘনিয়েছে এ বাংলার বুকে। গত বছরের কুমোরটুলিতে দেখা গিয়েছিল বিভিন্ন রকমের সারি সারি ঠাকুর, আবার কত ঠাকুর রওনা দিচ্ছে দেশ বিদেশের উদ্দেশ্যে।

কিন্তু এই বছরের কোলাহলপূর্ণ কুমোরটুলির সেই চিত্রটাই সম্পূর্ণ শুনশান। কুমোরটুলির এক শিল্পী জানান, এই করোনার জন্য তারা ওর্ডার ছাড়া কোন ঠাকুরই গড়ছেন না এবার। ওর্ডার যা পাচ্ছেন তা সবই একচালার, এবছর আর বড়ো ঠাকুর করাতে চাইছেন না কেউই। আর অন‍্য বছরগুলোতে যেখানে প্রায় ১০০টার মতো বড়ো ঠাকুরের ওর্ডার পেতেন তিনি, সেখানে ৪-৫ টা ছোট ঠাকুরের ওর্ডার পেয়েছেন মাত্র। ফলত মৃৎশিল্পীরা অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন বলেই জানাচ্ছেন তিনি। তেমনি অর্থনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হচ্ছেন হস্তশিল্পের শিল্পীরাও।

হাতিবাগান, শ‍্যামবাজার, খিদিরপুরের মতো জায়গাগুলি যেখানে গত বছরগুলিতে প্রতিমা বায়নার খরিদ্দার ও বিক্রেতাদের কোলাহলে গমগম করত, এবছর সেই জায়গাটাই কেমন যেন শান্ত। আর্থিক সংকট থেকে বাদ যায় নি বাঁকুড়া, বীরভূম, মূর্শিদবাদের ঢাকি শিল্লীরাও। বস্তুত, প্রতিবছর এই পুজোর চারটে দিনই ঢাক বাজিয়েই তারা সারাবছরের রোজগার করে থাকেন। কিন্তু করোনার দরুন এবছরের চিত্রটি সম্পূর্ণ আলাদা।

মূর্শিদবাদের এক ঢাকি শিল্পী জানান, করোনার জন্য পুজো কম হওয়ার দিকে ঝুঁকছে বলেই ঢাক বাজানোর ওর্ডার সেরকম পাননি। আবার ট্রেনে করে কলকাতায় এসে করোনা সংক্রমণের ভয় ঢাক বাজাতেও আসতে চাইছেন না প্রায় কেউই। তিনি আরও বললেন যে, বন‍্যার প্রভাবে চাষের শস‍্যও নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ফলত করোনার এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আর্থিক অনটনেরও মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। কেরালার সরকার বলেন, কোন একটি জায়গায় বিপুল সংখ্যক মানুষ জমায়েত হলে করোনা আক্রান্তের সংখ্যাও দ্রুতহারে বাড়ে।

এই সংক্রমণকেই গোষ্ঠী সংক্রমণ বলে আখ‍্যা দিয়েছেন। রাজ‍্য সরকারের পক্ষ থেকে বাংলার স্বরাষ্ট্র সচিব আলাপন বন্দ‍্যোপাধ‍্যায় সাংবাদিক বৈঠকে জানান, কেরালার মতো এ পশ্চিমবঙ্গেও শুরু হয়েছে সেই গোষ্ঠী সংক্রমণ। তাই এই গোষ্ঠী সংক্রমণের চেনটাকে ব্রেক করার জন্য রাজ‍্যে সপ্তাহে দুই দিন সম্পূর্ণ লকডাউন চালু করা হয়েছে। তিনি আরও জানান যে, চলতি সপ্তাহে বৃহস্পতি ও শনিবার সম্পূর্ণ লকডাউন এবং আগামী সপ্তাহে বুধবার দিনটা লকডাউন করা হবে।

আর আগামী সপ্তাহে লকডাউনের দ্বিতীয় দিনটি সোমবার বৈঠকে বসে ঠিক করা হবে। তিনি আরও বলেন, এই ভাবে সপ্তাহে দুই দিন করে আগস্ট মাস পর্যন্ত সম্পূর্ণ লকডাউন করা হলে, গোষ্ঠী সংক্রমণকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে। আবার অন‍্যদিকে বাংলার মুখ‍্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এদিন সাংবাদিক বৈঠকে সকলের উদ্দেশ্যে বলেন, সকলকে সুস্থ থাকতে হবে তো, কারণ সামনেই যে আসচ্ছে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজো। এখনই সংক্রমণ কমাতে ক্লাবগুলি নিজ নিজ এলাকায় ভূমিকা নিক বলেই জানিয়েছেন তিনি।

রাজ্যের মুখ‍্যমন্ত্রীর এইরূপ আশ্বাসবানীতে পূজো প্রেমিকরা অনেকটাই ভরসা পাচ্ছেন। অনেকেই নিজ নিজ এলাকায় ক্লাব ভিত্তিক সংগঠন তৈরি করেছেন। সকলেই ঠিক করছেন বাজেট কমাতে এ বছর ছোট করেই পুজো সারবেন। এবং সেই সঙ্গে ভাবছেন সামাজিক দূরত্ব যাতে বজায় থাকে, তাই প্রবেশ পথে অনেকটাই বিস্তারিত জায়গা রাখতে হবে এবং স‍্যানিটাইজারের ব‍্যাবস্থাও রাখবেন বলেও ভেবেছেন অনেকেই। আবার কেউ কেউ তো মাস্ক ছাড়া পুজো মন্ডপে প্রবেশ নিষেধ বলেই জানাছেন।

কিন্তু কোন কোন উদ‍্যোক্তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। কেউ কেউ ভাবছেন দুর্গাপূজোতে যে বিপুল পরিমাণে ঢল নামে রাস্তায়, সেখানে যদি কোন মানুষ বিশেষজ্ঞদের মতানুযায়ী গোষ্ঠী সংক্রমণের প্রভাবে আক্রান্ত হন? তাহলে কি আরও উর্ধ্বমুখী হবে করোনার গ্ৰাফ? অন্যদিকে অনেক উদ্যোক্তারাই বলছেন, ঢাকিরা করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে কলকাতার এই করোনা আবহে আসতে চাইছেন না। তাহলে ঢাকের শব্দ ছাড়াই কি পুজো হবে এবার?

Leave a Reply

%d bloggers like this: