প্রিন্ট ও ইলেকট্রিকস মিডিয়ার মতো এবারে অনলাইন নিউজ পোর্টালকে মান্যতার পাশাপাশি, তার রাশ টানতে নয়া নির্দেশিকা কেন্দ্রের

HnExpress ১২ই নভেম্বর, অরুণ কুমার ঃ
মিডিয়া হলো আমাদের চলতি জীবনের এক অপরিহার্য অংশ। এই অবস্থায় আমরা খবরের কাগজে রোজ চোখ রাখি না কিংবা টিভিতেও অনেক সময় খবর দেখা হয়ে ওঠে না। তাই প্রতিদিনের খবর জানতে আমাদের এখন বড় ভরসা অনলাইন নিউজ পোর্টাল বা ডিজিটাল মিডিয়া। তবে সরকারিভাবে এতদিন এই নিউজ পোর্টালগুলির কোন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ছিল না। তবে এবার কেন্দ্রীয় সরকার এবিষয়ের কথা মাথায় রেখে এক বিশেষ পদক্ষেপ নিতে চলেছে। প্রিন্ট ও ইলেকট্রিকস মিডিয়ার মতো এবারে অনলাইন নিউজ পোর্টালকে মান্যতার পাশাপাশি, তার রাশ টানতে নয়া নির্দেশিকা কেন্দ্রের।

এখন থেকে ইলেকট্রনিকস এবং প্রিন্ট মিডিয়ার মত ডিজিটাল মিডিয়াতেও এবার যাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা তৈরি হয় তার জন্য আবেদন জানাল কেন্দ্র। উল্লেখ্য যে, প্রিন্ট বা টেলিভিশন চ্যানেল গুলিতে প্রকাশিত খবর অথবা বিজ্ঞাপন বা ফিল্ম রিলিজের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার ছাড়পত্রের প্রয়োজন হলেও এত দিন পর্যন্ত অনলাইনে প্রচারিত কনটেন্টের জন্য কোনও সরকারি ‘ছাঁকনি’ ছিল না। তবে এবার থেকে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত ফিল্ম বা ওয়েব কনটেন্টের প্রচারের আগে তাতে তথ্য-সম্প্রচার মন্ত্রকের অনুমোদন লাগবেই লাগবে।

একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে অনলাইনে প্রকাশিত সমস্ত অডিয়ো-ভিস্যুয়াল বা কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও। এতদিন পর্যন্ত খবর বা স্ট্রিমিং-এর ডিজিটাল কনটেন্টের উপরে কোনো রকম নজরদারি চালানোর জন্য কোনও আইন বা স্বশাসিত সংস্থা ছিল না। কিন্তু সম্প্রতি একটি স্বশাসিত সংস্থার মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মগুলির উপর নজরদারি চালানোর দাবি জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে একটি পিটিশন দাখিল করা হয়েছিল। তারই ভিত্তিতে গত মাসে এই ব্যাপারে কেন্দ্রের কাছে জবাবদিহি চায় দেশের শীর্ষ আদালত।

এরপরেই কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক, ইন্টারনেট এবং মোবাইল অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়াকে নোটিশ পাঠায় আদালত। প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে হয় যে, কিছু বাণিজ্যিক সংস্থা নেটফ্লিক্স-অ্যামাজন-হটস্টারের মতো ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলি উপর আইন বিধিবদ্ধ স্বশাসিত সংস্থার নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলেই আবেদন জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা রুজু করা হয়েছিল গত অক্টোবর মাসে। সেই মামলায় কোনও রকমের সেন্সর ছাড়াই ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কনটেন্ট দর্শকদের কাছে পৌঁছচ্ছে বলে জানানো হয়েছিল।

এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন রয়েছে বলে মত ছিল আবেদনকারীর। সেক্ষেত্রে কেন্দ্রের বক্তব্য জানতে চেয়ে ছিল শীর্ষ আদালতের ৩ সদস্যের বেঞ্চ। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এ এস বোবডে, বিচারপতি এ এস বোপান্না এবং বিচারপতি ভি রামসুব্রহ্মণ্যনের বেঞ্চ এই নিয়ে নোটিস পাঠিয়ে ছিল কেন্দ্রীয় সরকার, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক এবং ইন্টারনেট অ্যান্ড মোবাইল অ্যাসোসিয়েশন (আইএএমএআই)-কে। অবশ্য এ নিয়ে অপর একটি মামলায় গত বছর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকর জানিয়ে ছিলেন যে, মিডিয়ার অগাধ স্বাধীনতায় রাশ টানতে হয়তো পদক্ষেপ নিতে পারে সরকার।

যদিও ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলিতেও প্রিন্ট বা ফিল্মের মতোই নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিতও দিয়ে ছিলেন তিনি। সেই কথা মাথায় রেখেই টিভি ও প্রিন্ট সংবাদ মাধ্যমের আগে ডিজিটাল মিডিয়ার খবরের মান ও স্বচ্ছতা নিয়ন্ত্রণের উপর কড়া নজর দিয়ে সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন তৈরি করার কথা জানানোর জন্য সুপ্রিম কোর্টের কাছে আবেদন করেন তাঁরা। এক হলফনামায় কেন্দ্র জানিয়েছে, হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুকের মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের দৌলতে ডিজিটাল মিডিয়ার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু অনেকেই সেই খবরের সত্যতা যাচাই না করেই তা ভাইরাল করে দেয়। ফলে এই বিষয়ে বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। অপরদিকে প্রিন্ট ও টিভি মিডিয়াতে যথেষ্ট প্রস্তুতি এবং বিবেচনা করে খবর ছাপা বা দেখানো হয়। দুটির ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট গাইডলাইন রয়েছে। কিন্তু নতুন এই ডিজিটাল মিডিয়াতে তার কোনটাই নেই, তাই আগে ডিজিটাল মিডিয়ার জন্য গাইডলাইন তৈরি করা খুবই জরুরী বলে সরকারি সুত্রে জানানো হয়েছে। ফলে এখন অনলাইন নিউজ পোর্টাল-সহ নেটফ্লিক্স, অ্যামাজনের মতো সমস্ত ওভার দ্য টপ (ওটিটি) প্ল্যাটফর্মের কনটেন্টের রাশ নিজের নিয়ন্ত্রণে আনল কেন্দ্রীয় সরকার।

এ বার থেকে অনলাইনে পরিবেশিত সমস্ত কনটেন্টের জন্য কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের ছাড়পত্রের প্রয়োজন হবে। বিগত সোমবার কেন্দ্রীয় সরকারের এই সংশোধনীতে স্বাক্ষর করে তা অনুমোদন করেছেন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। বর্তমানে প্রিন্ট মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিষয়ে দেখাশোনা করে প্রেস কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ মূলত দেখাশোনা করেন নিউজ ব্রডকাস্টার্স স্ট্যান্ডার্ড অথরিটি। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই ডিজিটাল মিডিয়া কর্মীদের মধ্যেও কেন্দ্রীয় সরকারের এই ঘোষণায় ভালোই সাড়া মিলেছে।

এছাড়াও এই নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠিত হলেই ডিজিটাল মিডিয়া একটি ছাতার তলায় আসতে পারবে। এবং ফেক নিউজের রমরমাও বন্ধ হবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় সরকার। এই ব্যবস্থায় ডিজিটাল মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিকরা, আলোকচিত্রী ও ভিডিওগ্রাফাররা বেশকিছু সুযোগ সুবিধাও পাবেন। আর সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, প্রেস ইনফর্মেশন ব্যুরো দ্বারা অনুমোদিত অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড, যার সাহায্যে তাঁরা হাতে-কলমে তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন। সিজিএইচএস-এর আওতায় থাকা সুবিধা এবং রেল ভাড়ায় ছাড়ও মিলবে।

এছাড়াও যাদের কাছে অ্যাক্রেডিশন কার্ড থাকবে তারা ব্যুরো অফ আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন-এর মাধ্যমে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন দেওয়ার সুবিধাও পাবেন। প্রসঙ্গত, প্রিন্টের যাবতীয় কনটেন্টের দেখাশোনার দায়িত্ব রয়েছে প্রেস কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া (পিসিআই), আর টেলিভিশনে প্রচারিত খবরাখবরের জন্য রয়েছে নিউজ ব্রডকাস্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (এনবিএ) এবং বিজ্ঞাপনী কনটেন্ট-এ নজরদারির জন্য রয়েছে অ্যাডভার্টাইজিং স্ট্যান্ডার্ড কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া। অন্যদিকে, ফিল্ম রিলিজের আগে তা সেন্সর বোর্ডের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।

তবে ওয়েব কনটেন্ট প্রকাশের জন্য কোনও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা আইন নেই। নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে এবার তাতে হস্তক্ষেপ করল কেন্দ্রীয় সরকার, এমনটাই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। আপাতদৃষ্টিতে কেন্দ্র সরকার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অনলাইন নিউজকে স্বীকৃতি দিয়েছে এমনটা মনে করা হলেও, আসলে সংবিধানের ৭৭ নম্বর ধারার ৩ নম্বর শাখার ১৯৬১ সালের আইনকে সংশোধিত করছে কেন্দ্র সরকারের সূচনা ও সম্প্রসারণ মন্ত্রক। রাষ্ট্রপতি এই সংশোধনে ইতিমধ্যেই সাক্ষর করেছেন বলে জানা গেছে।

তবে মন্ত্রকের তরফ থেকে পাবলিক নোটিশ এখনো জারি করা হয়নি। যা হয়ত এই চলতি সপ্তাহেই জারি করা হবে। এখন দেখার বিষয় আগামী দিনে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ডিজিটাল মিডিয়া সম্পর্কিত নীতিমালা বা গাইডলাইন কবে নোটিফিকেশনের মাধ্যমে প্রকাশ করছে। আর তা জানতে হলে তার জন্য আমাদের আর কিছুদিন অপেক্ষা করতেই হবে।

Leave a Reply

Latest Up to Date

%d bloggers like this: