আকাশ ছোঁয়া বিলের অঙ্কে হাসপাতাল গুলিতে চাপা পড়ছে করোনার সুচিকিৎসা

HnExpress ১৪ই অগাস্ট, ঝুম্পা দেবনাথ, কলকাতা ঃ বাংলার আকাশে করোনার ছায়ায় চাপা পড়ে অকালেই প্রাণ হারাচ্ছেন বহু মানুষ। আকাশ ছোঁয়া বিলের অঙ্কে হাসপাতাল গুলিতে প্রতিনিয়ত চাপা পড়ছে করোনার সুচিকিৎসা। দৈনিক সংক্রমণের নিরিখে ভারত প্রথম সারিতে উঠে এসেছে। স্বাস্থ্য দফতরের দেওয়া বুলেটিন থেকে জানা যায়, গত ২৪ ঘন্টায় দেশে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৬৬ হাজার ৯৯৯ জন এবং মৃত ৯৪২ জন। দেশে মোট করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ২৩ লক্ষ ৯৬ হাজার ৬৩৭ জন এবং দেশে করোনায় মোট মৃত্যু হয়েছে ৪৭ হাজার ৩৩ জনের।

ভয়াবহ করোনা নামক মহামারীর হাত থেকে প্রিয়জনদের রক্ষা করতে সুচিকিৎসার আশায় অনেকেই রোগীকে নিয়ে ছুটে যাচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। করোনায় সদ‍্য স্বামী হারানো তমলুকবাসী ষাট বছরের করোনা আক্রান্ত লায়লা বিবির পরিবারও সুচিকিৎসার আশায় নিয়ে যান বাইপাসের ধারে ডিসান নামক এক বেস‍রকারি হাসপাতালে। ‘আগে ৩ লক্ষ টাকা জমা দিন, তারপর চিকিৎসা শুরু করা হবে’, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরিবারকে এমনটাই জানিয়েছিলেন বলেই অভিযোগ। টাকা জোগাড় করতে দেরি হওয়ায় অ্যাম্বুল‍্যান্সে মৃত্যু হয় রোগিনীর।

পরিবার সূত্রে দাবি, কোভিড পজিটিভ আসার পর তীব্র শ্বাসকষ্টের কারণে ডিসান হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। হাসপাতালে ভর্তির জন্য ৮০ হাজার টাকা দিয়ে একটা বেড বুক করা হয়েছিল। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভর্তির সময় জানান, তিন লক্ষ টাকা চাই। কিন্তু ডেবিট কার্ডে তো দৈনিক লিমিট থাকায় বাড়ির লোক জানায় রাত ১২টার পর বাকি টাকা দিয়ে দেব, আগে চিকিৎসা তো শুরু হোক। কিন্তু তাতে রাজি হয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আরও দু লক্ষ টাকা যখন অনলাইন ট্রান্সফার করলাম ততক্ষণে বিনা চিকিৎসার অভাবে সব শেষ হয়ে গেছে একটি প্রাণ, এমনটাই জানা গেছে পরিবার সূত্রে।

এই ঘটনার খবর সংবাদমাধ্যমের দ্বারা সামনে আসতেই ডিসান হাসপাতালের বিরুদ্ধে রাজ‍্য স্বাস্থ্য কমিশন মামলা রজু করেন। তবে শুধুই ডিসানই নয়, এমন আরও এক বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধেও এই একই অভিযোগ উঠে এসেছে বারংবার। অন্যদিকে সংক্রমণের ভয় না করে চিকিৎসা করেছিলেন উওর ২৪ পরগনার শ‍্যামনগর নিবাসী প্রয়াত চিকিৎসক প্রদীপকুমার ভট্টাচার্য। চেম্বারে দীর্ঘ লাইন থাকত দরিদ্রদের। কারো থেকে টাকা নেননি, উল্টে যাকে যেমন পারতেন সাহায্য করতেন।

কিন্তু সদা সেবাপরায়ন এই চিকিৎসক প্রদীপ কুমারকেও রেয়াই দেয়নি কোভিড। কলকাতার মুকুন্দপুর বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও বাঁচানো যায় নি তাঁকে। মৃত্যুর পর তাঁর বিল হয় ১৮ লক্ষ টাকা। সারা জীবন দরিদ্রের সেবা করে কতটুকুই বা সঞ্চয় করা যায়? এই কথা কারোরই অজানা ছিল না। চিকিৎসক ভর্তি থাকাকালীন বিল চড়তে থাকায় শ‍্যামনগরের মানুষ ‘প্রদীপশিখা’ নামক একটা হোয়াইসঅ্যাপ গ্ৰুপ খুলে অর্থ সংগ্ৰহে নেমেছিলেন।

চিকিৎসক এর মৃত্যুর পর ব‍্যারাকপুরের সাংসদ অর্জুন সিং থেকে শুরু করে নৈহাটির বিধায়ক পার্থ ভৌমিক, মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম, ভাটপাড়ার পুর প্রশাসক অরুণ বন্দ‍্যোপাধ‍্যায় সহ বিভিন্ন স্তর থেকেই এই বিল কমানোর জন‍্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলা হয়। চিকিৎসকের পরিবার সূত্রে দাবি, ৩ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা কমানো হয়েছে হাসপাতাল থেকে। বিষয়টি রাজ‍্য স্বাস্থ্য কমিশনের নজরে এলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিলের তথ্য চেয়ে পাঠিয়েছে কমিশন।

শুধু তাই নয়, বিল পুনর্বিবেচনা করে আরও কিছু কমানো যায় কি না, সে দিকেও নজর রাখতে বলা হয়েছে কমিশন থেকে। করোনা রোগীদের বেড ভাড়ার বৃদ্ধির দিকে নজর রেখে রাজনৈতিক মহলে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
বিজেপি নেতা রাহুল সিংহা জানান, বেসরকারি হাসপাতালগুলো বিলের অঙ্ক বাড়াছে, আর সরকারি হাসপাতালগুলিতে কোন চিকিৎসাই পাচ্ছেন না রোগীরা। এই তো দেশের অবস্থা।
আবার কেউ কেউ মুখ‍্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রীকে করা ভিডিও কনফারেন্সে বলা কথাকে স্মরণ করে দিচ্ছেন।

তাঁরা বলছেন, মুখ‍্যমন্ত্রী বলেছিলেন আমাদের রাজ্যে সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। তাহলে ৩ লক্ষ টাকা না দিলে চিকিৎসা করা যাবে না, এটাই কি সে সঠিক চিকিৎসার নমুনা? তাহলে বিলে অতিরিক্ত কেন চার্জ ধরা থাকে? তার জন্যই কি পরবর্তীকালেও বিল কমাতে পারছে বেসরকারি হাসপাতালগুলি? তীব্র কটাক্ষের সুরে এমনটাই প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী মহলের একাংশ।

Leave a Reply

%d bloggers like this: