সিলিকোসিস মারণরোগে আক্রান্ত বহু মানুষ

HnExpress বিশেষ প্রতিবেদন, দেবনাথ চক্রবর্তী : ভয়াল সিলিকোসিস কেড়েছে বাঁচার অধিকার, ফুসফুসে পাথরকুচি নিয়ে মৃত্যুর অপেক্ষায় ওরা। পেট চালাতে পাথর ভাঙতে গিয়েছিলেন এরা। পাথরভাঙা কলে নিংড়ে দিয়েছিলেন নিজেদের। বুঝতেই পারেননি যে, একটু একটু করে জড়িয়ে পড়েছেন মৃত্যুফাঁদে। যখন বুঝলেন, ততক্ষণে ফুসফুসে পাথরকুচি আর বিষাক্ত গ্যাস জমে ওরা মৃত্যুপথযাত্রী।
পাথর ভাঙা কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে সিলিকোসিস বেশি দেখা যায়। পাথরের ধুলিকণা নাক, মুখ এমনকি চোখ দিয়ে ঢুকলে শ্রমিকরা এ রোগে আক্রান্ত হন। রোগের লক্ষণ হিসেবে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা দেখা দেয়। হাত-পা শুকিয়ে যেতে থাকে। শেষ পরিণতি মৃত্যু। ভূমি খনন করে পাথর উত্তোলন, পাথর নেটিং, ডাম্পিং ও ক্র্যাশিংয়ের সময় নাক মুখ দিয়ে ধূলাবালি শরীরে প্রবেশ করে। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করছেন পাথর শ্রমিকরা। ফুসফুসের এই দুরারোগ্য রোগে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে চলেছে। সিলিকোসিস রোগীর প্রয়োজন অক্সিজেন ও জরুরি ইঞ্জেকশন। কিন্তু গ্রামের কৃষক থেকে শ্রমিকে পরিণত হওয়া মানুষ এতটাই গরিব যে চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। হাড় জিরজিরে শরীরগুলো ক্রমশ বিছানায় মিশে যাচ্ছে। কাশির দমকে কারও মুখ থেকে রক্ত ওঠে। কেউ বা বুক ভরে বাতাস টানতেই জেরবার। ভারতে গ্রামের পর গ্রাম একই ছবি। ব্যতিক্রম নয় পশ্চিমবঙ্গও।

সাম্রাজ্যবাদী ক্যাপিটালাইস্ট দেশ আমেরিকা। ১৯৩৮ এর আমেরিকা; সেই সময় দাঁড়িয়ে তারা সিলিকোসিসের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর পক্ষে লড়াই করেছিল। নিজেদের দেশের মানুষকে রক্ষা করতে সেই সময়ের আমেরিকান মিডিয়া সিলিকোসিসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। আজ আমেরিকা প্রায় সিলিকোসিস মুক্ত।

২০১৮ ভারত; ১৫০ টির উপর কমিউনিস্ট পার্টি ভারতে। এই মুহূর্তে কমপক্ষে প্রায় ১.৫ কোটি শ্রমিক আক্রান্ত সিলিকোসিসে। আরও ১.৫ কোটি শ্রমিক পাথর খাদানে এই মুহূর্তে কাজ করছে যারা ধীরে ধীরে সিলিকোসিসের মৃত্যু ফাঁদের দিকে এগোচ্ছে। মিডিয়া সম্পূর্ণ চুপ, কমিউনিস্ট পার্টি গুলোর ভূমিকা নেই প্রায়, দক্ষিণপন্থী পার্টিগুলো স্বাভাবিকভাবে পুঁজির পক্ষে, মালিকের পক্ষে, শ্রমিক হত্যার পক্ষে। রাষ্ট্রের কোনও ভূমিকা নীতি নেই সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকদের জন্য। আসলে সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকরা মারা যাচ্ছে না মালিকপক্ষের হাতে রাষ্ট্রের সহযোগিতায় খুন হচ্ছেন প্রতিদিন।

আজ ১৯৩৮ সে আমেরিকার সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকদের নিয়ে একটি রিপোর্ট তুলে ধরলাম। আজ ২০১৮ তে ভারতে এক কোটি মানুষ সিলিকোসিসে আক্রান্ত যার অর্থ এক কোটি মানুষেরই মৃত্যু অর্থাৎ শ্রমিক শ্রেণীর হত্যা মালিকের দ্বারা রাষ্ট্রের সহযোগিতায়।

স্বরজিৎ, গিয়াসুদ্দিনরা চাষির ছেলে; বাড়ি উত্তর ২৪ পরগনায়। বর্তমান আর্থ-সামাজিক অবস্থায় চাষের কাজে যে অর্থ উপার্জন তাতে সংসার চালানো মুশকিল তাই কাজের খোঁজে বেরিয়ে পরে এবং কাজ জুটেও যায়। পাথর খাদানে ২৫০ টাকা রোজে চাষি শ্রমিকে রূপান্তরিত হয়; কিন্তু সে জানতেই পারল না অতি মুনাফার লোভে পাথর ভাঙার কারখানার মালিক তাকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। স্বরজিৎ মারা গেছে এবং গিয়াসউদ্দিন এই মুহূর্তে সিলিকোসিস রোগে আক্রান্ত; গিয়াসুদ্দিন ভারতের ১.৫ কোটি সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকের একজন জীবিত প্রতিনিধি। গিয়াসুদ্দিন স্বরজিৎরা হিন্দু অথবা মুসলিম নয়, কংগ্রেস, তৃণমূল, সিপিএম বা বিজেপি নয়। ওদের সবার পরিচিতি ওরা শ্রমিক শ্রেণীর প্রতিনিধি। কাজ করে যা আয় হয়েছিল তার সবটুকু খরচ হয়ে গেছে ওদের চিকিৎসায়, তারপর পরিবার লাখ টাকা ধার করে চিকিৎসা চালিয়ে গেছে কিন্তু ফল… শুধু মৃত্যুর প্রতীক্ষা; সিলিকোসিস আক্রান্তদের সন্তান, স্ত্রীর, অসহায় বৃদ্ধ বাবা মাদের ভবিষৎ কী?

ভাল খবর হল


১। কোন পাথর খাদানের মালিক সিলিকোসিসে মারা যায় না; বরং লাফিয়ে লাফিয়ে তাদের মুনাফা এবং সম্পত্তি দুই বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিদিন।
২। মেডিকেল ব্যবসাতে এদের কল্যাণে মুনাফা বাড়ছে।
৩। এভাবে চলতে থাকলে পেটের দায় একদিন এই শ্রমিকদের স্ত্রী নিজের চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হবেই।
৪। এই শ্রমিকদের সন্তানরা হয় আরও সস্তা শ্রমিকে রূপান্তরিত হবে অথবা ভদ্রলোকদের ভাষায় সমাজ বিরোধী হয়ে উঠবে এবং তাকে রাষ্ট্রের শাসকরা ব্যবহার করবে।
৫। আপনার বাড়ির চকচকে মার্বেল আরও চকচকে হয়ে উঠবে।

সিলিকোসিস নিয়ে লড়াই , আক্রান্তদের মৃত্যু, ঐক্যবদ্ধ শ্রেণীর লড়াই, কলকাতা হাই-কোর্টের রায় নিয়ে কিছু মানুষ অবগত। এইবার আরও বৃহত্তর লড়াইয়ের দিকে আক্রান্ত শ্রমিকরা জোট বাঁধছে। হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক দল নির্বিশেষে বৃহত্তর শ্রমিক শ্রেণী নিজেদের অধিকারের লড়াইতে জোট বাঁধছে। তার প্রথম পদক্ষেপ “সিলিকোসিস আক্রান্ত সংগ্রামী শ্রমিক কমিটি”র ডাকে উত্তর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার শ্রমিক কৃষকরা সিলিকোসিস আক্রান্তদের অধিকার এবং অবৈধ পাথারখাদানগুলো বন্ধের দাবিতে আগামী ২৫ অক্টোবর, ২০১৮ এক মিছিলের ডাক দিয়েছে মালঞ্চ বাজার থেকে মিনাখাঁ পর্যন্ত। SASSC এর নেতৃত্বে এই মিছিল হবে। সকলের কাছে অনুরোধ এই মিছিলে যোগদান করুন এবং এই মিছিলের খবর সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিন। বিশদ জানতে যোগাযোগ করুন 09062311348 হোয়াটস অ্যাপ নম্বরে।

4 thoughts on “সিলিকোসিস মারণরোগে আক্রান্ত বহু মানুষ

  1. শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন এই গুরুত্বপূর্ণ খবরটির জন্য…..

    1. এতো শুধু খবর নয় এ একটা আন্দোলন। সেই আন্দোলনের রূপকার হিসাবে তোমাকে ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা।

      1. অশেষ শুভেচ্ছা…..প্রবীর দা । আমি কঠিন লড়াই করা মানুষ । তাই কোনও বেঈমানই আমাকে পরাস্ত করতে পারে না ॥

Leave a Reply

Latest Up to Date

%d bloggers like this: