অন্তরালে থেকে গেলেন নেতাজী গবেষক হরি বাসুদেবন

HnExpress ১১ই মে, অরুণ কুমার, কলকাতা ঃ সম্প্রতি প্রয়াত ইতিহাসবিদ তথা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক হরি বাসুদেবন। ফলে অন্তরালে থেকে গেলেন নেতাজী গবেষক হরি বাসুদেবন। শনিবার সল্টলেকের এক বেসরকারি হাসপাতালে মৃত্যু হয় তাঁর। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, করোনা ভাইরাস সংক্রমণের উপসর্গ নিয়েঅ গত ৪ঠা মে ওই হাসপাতালে ভরতি হন CD ব্লকের বাসিন্দা বছর আটষট্টির এই ইতিহাসবিদ। ৬ তারিখ তাঁর সোয়াব টেস্টের রিপোর্ট পজিটিভ পাওয়া যায়।

তারপর থেকে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ভেন্টিলেশনে দেওয়া হয়। করোনা যুদ্ধে শনিবার রাতেই হারাতে হয় হরি বাসুদেবনকে।
পরিবার ও হাসপাতাল সূত্রের খবর, মে মাসের প্রথম থেকেল জ্বরে ভুগছিলেন তিনি। ছিল করোনা সংক্রমণের উপসর্গও। মে এর ৪ তারিখ হাসপাতালে ভরতি হওয়ার পর করোনা পজিটিভ রিপোর্টও আসে তাঁর। আর তারপর থেকেই ছিলেন ভেন্টিলেশনে। এবারে করোনা এমন এক মানুষকে নিয়ে গেল যা আমাদের মত কিছু নেতাজী প্রিয় অনুরাগীদের চরম ক্ষতি করে দিল।

ছাত্রছাত্রীদের কাছেও বেশ জনপ্রিয় ছিলেন এই ইতিহাসের ‘স্যার’ বাসুদেবন। করোনা আক্রান্ত হয়ে তাঁর এভাবে চলে যাওয়াটা মেনে নিতে পারছেন না কেউই। প্রসঙ্গত বলতে হয়, যে হরি বাসুদেবন হচ্ছেন সেই নির্ভীক ইতিহাসবিদ যাকে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন মোরাজি দেশাই নেতাজী সুভাসচন্দ্র বসুর মৃত্যু রহস্য নিয়ে তিন সদস্যের কমিটিতে রেখেছিলেন। এই কমিটিতে ছিলেন ডক্টর পূরবী রায়ও। রাশিয়া, তাইহুকো, জাপান ঘুরে এই কমিটি বলেছিল নেতাজীর বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়নি। কংগ্রেস এর হাজার প্রলোভনও তাঁকে সত্যি থেকে টলাতে পারেনি।

হরি বাসুদেবন বলেছিলেন রাশিয়ার আর্কাইভে লুকিয়ে আছে নেতাজী সুভাসচন্দ্র বসুর শেষদিনের ঘটনা। ভারত রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক সর্ম্পক দৃঢ় করা নিয়ে ও নেতাজী সুভাসচন্দ্র বসুর অজানা রহস্য উন্মোচনে তাঁর ভূমিকা কোনদিন ভোলার নয়। তবে বেদনার কথা হল মুরাজ্জি দেশাইয়ের পর আর কোন প্রধানমন্ত্রীই তাঁকে নেতাজী রহস্য উন্মোচনের জন্য সেভাবে কাজে লাগায়েনি। জন্মসূত্রে তিনি তামিল হয়েও নেতাজীকে নিয়ে যখন লড়াই করে গেছেন তখন এই বাংলার কিছু স্বার্থপর মানুষ ও গান্ধী পরিবারের চাটুকার নেতারা প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন হরি বাসুদেবনকে যেন নেতাজী মৃত্যু রহস্য বিষয়ক কমিটিতে না রাখা হয়।

এক বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন এই ইতিহাসবিদ্ ও গবেষক ড: হরি বাসুদেবন।
রুশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে তাঁর দীর্ঘ গবেষণার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রকের উপদেষ্টা পদেও ছিলেন হরি বাসুদেবন। উল্লেখ্য, কেমব্রিজ ফেরত এই ইতিহাসবিদের কেরিয়ার বেশ চমকপ্রদ। ভারত ও ইউরোপীয় গণতান্ত্রিক কাঠামো, রুশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে তিনি পড়াশোনার ও গবেষণার পর দেশে ফিরেও কর্মক্ষেত্রে যোগ দেন। সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতি নিয়েও তাঁর বিস্তর গবেষণা রয়েছে, যা ইতিহাসের গুরুত্বপূ্র্ণ অবদান হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত।

রুশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে তাঁর লেখা দুটি বই উচ্চশিক্ষারত ইতিহাসের পড়ুয়াদের বিশেষ পছন্দের। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ইনস্টটিটিউট অফ এশিয়ান স্টাডিজ, দিল্লির জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষকতা করেছেন তিনি। আর সেই ইতিহাসবিদ হরি বাসুদেবনের আকস্মিক প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেছেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী। তাঁর নেতাজির ফাইল সংক্রান্ত গবেষক জয়দীপ মুখোপাধ্যায় তিনিও এক শোক বার্তায় জানিয়েছেন ইতিহাসবিদ হরি বাসুদেবনের আকস্মিক প্রয়াণে দেশের এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল।

নেতাজির অন্তর্ধান সংক্রান্ত রহস্য উন্মোচনে তার ভূমিকাও ছিল যথেষ্ট ইতিবাচক, এ প্রসঙ্গে তিনি আরও যে কথা জানিয়েছেন সেটা হল— নতুন প্রজন্মের এ বিষয়ে জানা উচিত। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত রাশিয়া ভেঙ্গে ষোলটি অংশে বিভক্ত হয়ে যায়, তখন কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটিতে যে সমস্ত ইতিহাসবিদ ছিলেন যারা ভারত ও রাশিয়া বন্ধুত্বমূলক বিষয়ের উপর কাজ করতেন। তাদের মধ্যে অন্যতম সেই সময় তিন সদস্যের একটি দল ইতিহাসবিদ গবেষক অধ্যাপিকা পূরবী রায়ের নেতৃত্বে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন।

যাদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক শোভনলাল দাশগুপ্ত এবং এই অধ্যাপক হরি এস বাসুদেবন ছিলেন অন্যতম। তাঁরা যখন ইন্দো সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তির বিষয় নিয়ে মস্কোয় কর্মরত ছিলেন, তখন সেই দলে আরো কয়েকজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরা হলেন প্রয়াত ফরওয়ার্ড ব্লক দল এর প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক চিত্ত বসু, প্রয়াত বিদেশ মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ, প্রয়াত লোকসভার অধ্যক্ষ পিএ সাঙগমা। ওই সময় আরো একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে বলে শ্রী মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন তা হল, অধ্যাপক পূরবী রায় সেই সময় তার রাশিয়ান বন্ধু এবং প্রাক্তন লেফটেন্যান্ট জেনারেল কোলেশ নিকোভকে সঙ্গে নিয়ে মস্কোর কাছেই সামরিক গবেষণারে যান।

যার নাম গ্রু-আর্কাইভ। সেখানে তার এবং এই বাসুদেবন এর অধিক প্রচেষ্টায় এই গ্রুপটি আর্কাইভ থেকে নেতাজি সংক্রান্ত কিছু তথ্য উদ্ধার করেন। বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তখন যখন ড: পূরবী রায় আর্কাইভ থেকে যে সমস্ত তথ্য আনেন তা থেকে দেখা যাচ্ছে যে ১৯৪৬ সালে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের যিনি রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন যোশেফ স্টালিন অর্থাৎ তার বিদেশমন্ত্রী জ্যাকভ, সামরিক উপদেষ্টা মলোটভ কে নিয়ে আলোচনা করছেন যে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে কোথায় রাখা হবে।

এবং এ বিষয়ে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংক্রান্ত আর্কাইভ ফাইলের থেকে উদ্ধার করেছিলেন এবং আরও যে বিষয়টি উঠে আসে সেটা হচ্ছে যে তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনা আর কিছুই নয় একটি সাজানো ঘটনামত্র এবং এই সমস্ত বিষয়গুলি নিয়ে যিনি কাজ করছিলেন তার মধ্যে অন্যতম ছিলেন এই হরি বাসুদেবন। পরবর্তীতে মুখার্জি কমিশন যখন গঠিত হয় তখন ড: পূরবী রায়ের বক্তব্যকে সমর্থন করেছিলেন এই প্রয়াত অধ্যাপক।

নেতাজীর অন্তর্ধানের ইতিহাস গবেষণার একজন বলিষ্ঠ সাক্ষী হিসেবে হরি বাসুদেবন ছিলেন নির্ভিক ব্যাক্তি। এই সময়ে হরি বাসুদেবন এর এভাবে চলে যাওয়াটা নেতাজী অন্তর্ধান বিষয়ক গবেষণার ক্ষেত্রে এক সুবিশাল ক্ষতি বলে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জয়দীপ মুখোপাধ্যায়। আজ তাই কেবল ব্যাথিত হৃদয়ে ইতিহাসবিদ হরি বাসুদেবন এর আত্মার চির শান্তি কামনা করি।

 

Leave a Reply

Latest Up to Date

%d bloggers like this: